ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রতিক্রিয়া

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রতিক্রিয়া আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “ভোক্তা ও ব্যবসায় বাজার ও ক্রেতার আচরণ” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রতিক্রিয়া

ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের কার্যক্রম প্রক্রিয়া শুরু করার সময় প্রথমেই ক্রেতা জেনে নেয় কোনো ক্রয় পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করছে। প্রয়োজন অনুসারে ক্রেতা কখনো নিয়মিত সরবরাহকারি বা সম্পূর্ণ নতুন সরবরাহকারির কাছ থেকে ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করে থাকে। ব্যবসায় ক্রেতা পণ্য ক্রয় করার সময় সাধারণত একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মতিক্রমে ক্রয় করা হয়। ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ে এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই পণ্য ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় আটটি ধাপ সম্পন্ন করে ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করা হয়।

ক্রয় পরিস্থিতি

Buying Situations

ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে যা নির্ভর করে ব্যবসায়ের প্রকৃতির, নতুন পণ্য ক্রয় করার প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদির ওপর। ছোট প্রতিষ্ঠান এবং বড় প্রতিষ্ঠানের ক্রয় সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। ক্রয় পরিস্থিতির ধরণ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের সংখ্যা কম বেশি হয়। নিম্নে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের বিভিন্ন প্রকার ক্রয় সিদ্ধান্তে ধরণ আলোচনা করা হলো-

ক) সরাসরি পুনঃক্রয় (Straight rebuy ) : ব্যবসায় পণ্যের নিয়মিত ক্রয় প্রক্রিয়াকে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়া বলা হয় কারণ এখানে ক্রেতা কোনো কিছু পরিবর্তন না করে সরাসরি পূর্ববর্তী ক্রয় অনুযায়ী পুনঃক্রয়ের অর্ডার দিয়ে তাকে। সাধারণত পূর্বের ক্রয় যদি ক্রেতাকে পুরোপুরি তৃপ্তি দিয়ে থাকে। তখন সে ক্রয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেই পূর্বের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করে। এ ধরনের ক্রয় ক্ষেত্রে পণ্য পরিবর্তন এবং সরবরাহকারী পরিবর্তন করা হয় না বললেই চলে। সরবরাহকারীগণ নিয়মিত অর্ডার প্রাপ্তির আসায় পণ্য ও সেবার মান বজায় রাখতে চেষ্টা করে। নিত্য নৈমিত্তিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে বারবার অর্ডার প্রদানের ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যেই সাধারণত এ ধরনের সরাসরি পুনঃক্রয় অর্ডার দেয়া হয়।

খ) সংশোধিত পুনঃক্রয় (Modified Rebuying): সংশোধিত পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের বিভিন্ন ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়। বিশেষত সংশোধিত পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের জন্য নতুন শর্ত প্রদান করে। সাধারণত পণ্যের গুনাগুন, মূল্য, সেবা শর্ত, সরবরাহ প্রক্রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে আশা হয়। এ ক্রয়ের ক্ষেত্রে পুরাতন সরবরাহকারীদের মধ্যে অনিশ্চিয়তা কাজ করে এবং বর্তমান অবস্থা ধরে রাখার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করে। অন্যদিকে বাইরের সরবরাহকারীরা এ শর্তগুলিকে একটা সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহ সংশোধিত পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করতে চায়।

গ) নতুন কাজ (New Task) : নতুন ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মত একটি পণ্য বা সেবার ক্রয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। নতুন কাজ বলতে কোনো পণ্যের নতুন ক্রয়ের সূচনাকে বুঝায়। এ ক্রয়ের জন্য ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। যেহেতু প্রথমবারের মত একটি প্রতিষ্ঠান ক্রয় কার্যে অংশগ্রহণ করে ফলে এখানে ক্রেতার ঝুঁকির পরিমাণ বেশি থাকে। এ ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য ক্রেতাকে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য মূল্যায়ন করতে হয়। এখানে প্রথমবারের মত পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মূল্য, শর্ত, সেবা, অর্ডার ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। এ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের উচ্চ ব্যবস্থাপনার (Top Management) সিদ্ধান্ত জড়িত থাকে ।

পরিশেষে বলা যায় যে, ব্যবসায় বাজারের উল্লিখিত গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাপক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিপণন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। ব্যবসায় বিপণন কার্যক্রম সর্বত্র ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হয়।

ব্যবসায় ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা

Participants in the Business Buying Process

ব্যবসায় পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় বিপুল পরিমাণ অর্থের সাথে সাথে একাধিক ব্যক্তি এ প্রক্রিয়াতে জড়িত থাকে। ক্রয়কারি প্রতিষ্ঠানের যে অংশ এ সিদ্ধান্ত নেয় তাকে ক্রয় কেন্দ্র বলে। ক্রয় কেন্দ্রে যে সকল সদস্যগণ জড়িত থাকে তারা ক্রয় প্রক্রিয়াতে নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করে থাকে-

ক) সূচনাকারী (Initiators) : ক্রয় প্রক্রিয়ায় সূচনাকারীরা প্রথম পণ্য ক্রয় সম্পর্কে প্রস্তাব করে। এরা পণ্যটির ব্যবহারকারী অথবা সংগঠনের অন্য যেকেউ হতে পারে। সূচনাকারী একটি পণ্যের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে প্রথমে অনুভব (Feel) করে ।

খ) ব্যবহারকারী (Users): যারা পণ্যটি বা সেবাটি ব্যবহার করে। এরা অনেক সময় ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে থাকে এবং পণ্যের গুনাগুন, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

গ) প্রভাব বিস্তারকারী (Influencers): এ সদস্যরা পণ্য ক্রয় সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ সদস্যদের পণ্য সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান থাকে এবং ক্রয়ের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে থাকে। বিশেষ কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে থাকে ও পণ্য মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

ঘ) নির্ধারণকারী (Deciders): এ সদস্যরা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় এবং তাদের কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের সাথে জড়িত থাকে। কি পণ্য ক্রয় করা হবে, কোথা থেকে ক্রয় করা হবে, কত মূল্যে ক্রয় করা হবে, কোনো সময় ক্রয় করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকেন ।

ঙ) অনুমোদনকারী (Approvers): নির্ধারণকারী যে সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, অনুমোদনকারীরা সে সকল বিষয়ের আনুষ্ঠানিক অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ক্ষমতা রাখেন। সাধারণত নির্ধারণকারীরা যে ক্রয় প্রস্তাব পেশ করেন অনুমোদানকারীরা সেই প্রস্তাব পাশ করে অথবা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে।

চ) ক্রেতা (Buyers): যারা পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সকল প্রকার কার্যাবলি সম্পাদন করেন এবং চূড়ান্ত ক্রয় সম্পাদনের অধিকার রাখেন। এরা চূড়ান্তভাবে সরবরাহকারী নির্বাচন করে এবং ক্রয় শর্ত নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়। যদিও সরবরাহকারী ঠিক করাই এ সদস্যদের প্রধান কাজ তারপরও চূড়ান্ত ক্রয়ের সময় বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। জটিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এরা কোম্পানির ক্রয় অর্ডার ও শর্ত অনুসরণ করে থাকে।

ছ) গেটকিপার (Gatekeepers): যারা ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় অন্যের নিকট তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে তারাই গেইটকিপার। অনেক সময় গেটকিপারের কারণে এজেন্ট বা সরবরাহকারীরা প্রকৃত ব্যবহারকারী, সিদ্ধান্তকারী অথবা অনুমোদনকারীর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে। তারা এ যোগাযোগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভ্যর্থনাকারী (Receptionists), টেলিফোন অপারেটর, এমনকি ব্যক্তিগত সচিব যারা প্রকৃত ব্যবহারকারী, সিদ্ধান্ত প্রদানকারীদের সাথে বিক্রয়কর্মীদের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে গেটকিপার হিসেবে ।

সাধারণত ছোট প্রতিষ্ঠানে এবং নিয়মিত পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সকল সদস্যদের উপস্থিতি থাকেনা। এখানে সিদ্ধান্তকারী এবং ক্রেতার ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকে। কিন্তু জটিল অথবা কারিগরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সকল সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। বিপণনকারিকে ভালভাবে জানতে হবে কোন পণ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এদের ব্যবহারকারী কারা, কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িত, এবং কারা চূড়ান্ত ক্রয় সম্পাদন করবে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সেভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।

ব্যবসায় ক্রেতার উপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান

Major Influence on Business Buyers

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তের উপর মূলত চারটি উপাদান প্রভাব বিস্তার করে যা চিত্র ৪.৯ এ দেখানো হয়েছে। পরিবেশগত উপাদানের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক বর্তমান ও সম্ভাব্য অবস্থা যাচাই, সরবরাহের শর্ত নির্দিষ্ট করা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন জানা, রাজনৈতিক ও আইনানুগ নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা, প্রতিযোগির অবস্থা এবং সাংস্কৃতিক ও প্রথাগত বিষয়সমূহ। প্রতিটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সাংগঠনিক উদ্দেশ্য, রীতিনীতি, কৌশল, কাঠামো, গঠন ও পদ্ধতি রয়েছে। অনেক সময় ব্যবসায় ক্রেতা তার প্রতিষ্ঠানের ক্রয় বিভাগকে উন্নত করার চেষ্টা করে; আবার অনেকসময় দীর্ঘমেয়াদে চুক্তি, কেন্দ্রীভূত ক্রয় ও সঠিক সময়ে উৎপাদন পদ্ধতির মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পাদন করে।

ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ক্রয়কেন্দ্রের বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ককে আন্তঃব্যক্তিক উপাদান বলা হয়। ক্রয়কেন্দ্রের প্রত্যেক সদস্য একে অপরের সাথে সম্পর্ক, তাদের প্রভাব, কর্তৃত্ব, দক্ষতা, গতিশীলতা বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তার করে। ব্যবসায় ক্রয়সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যও ব্যপকভাবে প্রভাববিস্তার করে। অংশগ্রহণকারীদের বয়স, আয়, শিক্ষা, পেশাগত পরিচিতি, ব্যক্তিত্ব, ঝুঁকির প্রতি মনোভাব, লক্ষ্য, প্রত্যক্ষণ, এবং অগ্রাধিকার ইত্যাদি বিষয়াদি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত

 

ব্যবসায় ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

Business Buyers’ Decision Making Process

ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পণ্য ক্রয় করে না করে মূলত পুনঃউৎপাদনের জন্য পণ্য ক্রয় করে। একারণে এ পণ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত নতুন ধরনের পণ্য অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রথমবার ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা নিম্নলিখিত চিত্র ৪.১০ এর আটটি স্তর অতিক্রম করে পণ্য ক্রয় করে থাকে।

 

 

১. সমস্যা শনাক্তকরণ (Problem Recognition): প্রতিষ্ঠান যখন কোনো সমস্যা বা প্রয়োজন অনুভব করে, যা পণ্য বা সেবার ক্রয়ের মাধ্যমে মেটানো যায়, তখন থেকেই ব্যবসায় পণ্যের ক্রয় প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। বিভিন্ন ভাবে এ সমস্যা শনাক্ত করা যায়। যেমন: কোনো নতুন পণ্য উৎপাদনের জন্য আবার, বর্তমান পণ্যকে উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, মেশিন- যন্ত্রপাতি ইত্যাদির প্রয়োজন হতে পারে।

২. প্রয়োজনের বর্ণনা (Need Description) : সমস্যা শনাক্ত করার পর ক্রেতাকে প্রয়োজনের বর্ণনা করে এবং পণ্যের বৈশিষ্ট্য এবং পরিমাণ নির্ধারণে অগ্রসর হয়। ধরা যাক- কোনো পণ্যের মান উন্নয়ন অথবা মোড়ক পরিবর্তন দরকার অথবা মেশিন বিকল হবার কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বিষয় তিনটির আলাদা হবার জন্য প্রয়োজনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণনা করতে হয়। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তার প্রয়োজনের বর্ণনা প্রদান সম্ভবপর হয় না। সেই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ বিপণনকারি ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাকে তার প্রয়োজনের বর্ণনা প্রদান সহায়তা করতে পারে।

৩. পণ্য সুনির্দিষ্টকরণ ( Product Specification) : পণ্য প্রয়োজনের বর্ণনার পর ক্রেতাকে পণ্যের কারিগরি (Technical) মান ও বৈশিষ্ট্য ঠিক করে। পণ্য সুনির্দিষ্ট করার জন্য ক্রেতা কতগুলো প্রশ্নের মাধ্যমে পণ্যকে সুনির্দিষ্ট করে যা নিম্নরূপ-

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার মাধ্যমে ভ্যালু বিশ্লেষণ করে ক্রেতা পণ্যকে সুনির্দিষ্ট করে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য মান নির্দিষ্টকরণে বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয় করে থাকে।

৪. সরবরাহকারী অনুসন্ধান (Supplier Search): ক্রেতা এরপরে সর্বোত্তম বিক্রেতা বা সরবরাহকারী খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন উৎস থেকে ক্রেতা এ সরবরাহকারীর অনুসন্ধান করতে পারে। ক্রেতা প্রথমত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের তালিকা বা ট্রেড ডিরেক্টরী থেকে তার সরবরাহকারীর তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে তার সময় এবং খরচের উভয়ই কম হয়ে থাকে। এছাড়াও ইন্টারনেট, টেলিফোনে অথবা সরাসরি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে সরবরাহকারীর তথ্য নেয়া যেতে পারে। ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের সর্বদা সরবরাহকারিদের উৎস সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হয় যেন প্রয়োজনের সময় সহজেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায় ।

৫. প্রস্তাব সংগ্রহ (Proposal Solicitation): সরবরাহকারি অনুসন্ধানের পরবর্তী কাজ হলো সরবরাহকারিদের নিকট থেকে প্রস্তাব আহ্বান। অনুসন্ধানের সময়ই সরবরাহকারিদের সম্পর্কে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতার একটা প্রাথমিক ধারণা জন্ম নিয়ে থাকে। সেই ভাবে কিছু নির্বাচিত সরবরাহকারিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আহ্বানের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়। এ সময় সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ, ক্যাটালগ ইত্যাদি বিষয় ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতার নিকট প্রেরণ করে অথবা তাদের বিক্রয় প্রতিনিধি প্রেরণ করে থাকে। বিক্রয় প্রতিনিধি পণ্য বিক্রয়ের বিবিধ বিষয় নিয়ে সরাসরি ক্রেতার নিকট আলোচনা করে থাকে। জটিল ও ব্যয়বহুল পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতা সাধারণত সরবরাহকারির নিকট থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত বিস্তারিত প্রস্তাব আহ্বান করেন।

৬. সরবরাহকারী নির্বাচন (Supplier Selection): প্রস্তাব আহ্বানের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো সরবরাহকারী নির্বাচন। ক্রয় কেন্দ্রের সদস্যরা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে এবং সেখান থেকে তারা সরবরাহকারি নির্বাচন করে। সাধারণত সরবরাহকারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি প্যানেল তৈরি করা হয় যারা সরবরাহকারির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে থাকেন। সরবরাহকারী নির্বাচনে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ বিবেচনা করা হয়-

ক) পণ্যের গুণ (Quality of Product): কোনো একটি প্রতিষ্ঠান মান সম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারলে তাকে নির্বাচন করা হয়ে থাকে।

খ) অভিজ্ঞতা (Experience): নির্বাচনের সময় অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে কিছু জটিল পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রথম বারের মত পণ্য সরবরাহ করছে কিনা, এর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কিনা, যদি থাকে তবে কি ধরনের অভিজ্ঞতা- বিবেচনায় আনা হয়।

গ) ব্যবসায় শর্ত (Trade Term): ক্রেতার প্রত্যাশিত শর্ত অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কিনা যেমন- কিছু ক্রেতা বাকিতে পণ্য ক্রয় করতে চায়, কিছু ক্রেতা অগ্রীম পণ্য পেতে চায়। যে সকল সরবরাহকারি ক্রেতার সার্বিক শর্ত পূরণের ক্ষমতা রাখে তাদের নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দেয়া হয়।

ঘ) সুযোগ সুবিধা (Other Facilities): ক্রেতা সরবরাহকারি নিকট থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রত্যাশা করে। যেমন: পরিবহরণ সুবিধা, গুদামজাতকরণ সুবিধা, কারিগরি সুবিধা, অব্যবহৃত পণ্য ফেরত সুবিধা ইত্যাদি। এ সকল সুবিধা প্রদানের সরবরাহকারির ক্ষমতা কতটুকু তা বিবেচনা করা হয়।

ম) উপযুক্ততা (Appropriate): সরবরাহকারির যথাযথ যোগ্যতা আছে কিনা পণ্য সররাহের জন্য সেই দিকটি নির্বাচনের সময় দেখতে হয়।

চ) মূল্য (Price): সরবরাহকারি নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান বিষয় হলো মূল্য। সরবরাহকারী সঠিক মূল্যে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কিনা তা বিবেচনা করা হয় ।

ছ) অন্যান্য (Others): এছাড়া সরবরাহকারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সরবরাহকারির আচার আচরণ, সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, কাজের মূল্যায়ন, সরবরাহকারি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সকল বিষয় বিবেচনা করা হয়ে থাকে ।

৭. অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরণ (Order Routine Specification) : সরবরাহকারী নির্বাচন শেষ হলে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতা এ পর্যায়ে অর্ডার রুটিন নির্দিষ্ট করবে। অর্ডার নির্দিষ্টকরণের সময় আনুষ্ঠানিক কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। পণ্যশর্ত এবং ব্যবসায়িক শর্তগুলি আনুষ্ঠানিক ভাবে উল্লেখ থাকে। পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ, বিশেষ করে ক্রয় নীতির প্রধান দিকসমূহ যেমন- সঠিক গুন, সঠিক পরিমাণ, সঠিক সময়, সঠিক মূল্য ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করতে হয়। এছাড়াও এতে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ থাকে যেমন-নির্ধারিত সরবরাহকারিকে চূড়ান্ত অর্ডার প্রদান, কারিগরি মানের তালিকা প্রণয়ন, পণ্য পরিমাণ, ফেরত প্রদান নীতি, গ্যারান্টি ইত্যাদি।

৮. কার্যসম্পাদন পর্যালোচনা (Performance Review): অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরনের পর থেকে সরবরাহকারি অর্ডার অনুযায়ী ক্রেতাকে পণ্য সরবরাহ করবে। এ স্তরে ক্রেতা সরবরাহকারির নানাবিধ কার্যক্রম মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে অর্ডার নির্দিষ্টকরণে যে সকল বিষয় উল্লেখ ছিল তার সাথে সরবরাহকারির কার্যক্রম কতটা সংগতিপূর্ণ সেটা মূল্যায়ন করবে; সরবরাহকারির সরবরাহকৃত পণ্যের গুনগতমান ঠিক আছে কিনা; সরবরাহকারি সময়মত পণ্য সরবরাহ করেছে কিনা ইত্যাদি।

সর্বোপরি রুটিন অর্ডারে যে সকল শর্ত ছিল সেশর্তগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহকারি তার দায় দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেছে কিনা এ সকল বিষয় মূল্যায়ন করে ক্রেতা সরবরাহকারির সাথে নিয়মিত ব্যবসা করতে পারে, অথবা বিভিন্ন লেনদেনের সংশোধন করে ব্যবসা চালাতে পারে কিংবা তাকে বাদও দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, ব্যবসায় পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত উল্লেখিত আটটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। ছোট প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত সাধারণ পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতা অতিক্রম করে না তবে জটিল পণ্যের ক্ষেত্রে সকল স্তর অতিক্রম করতে হয়।

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রতিক্রিয়া

সারসংক্ষেপ:

ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে যা নির্ভর করে ব্যবসায়ের প্রকৃতির, নতুন পণ্য ক্রয় করার প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদির ওপর। ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের বিভিন্ন প্রকার ক্রয় সিদ্ধান্তে ধরণগুলো হলো- | সরাসরি পুনঃক্রয়, সংশোধিত পুনঃক্রয় ও নতুন কাজ। ক্রয়কারি প্রতিষ্ঠানের যে অংশ এ সিদ্ধান্ত নেয় তাকে ক্রয় কেন্দ্র বলে। ক্রয় কেন্দ্রে যে সকল সদস্যগণ জড়িত থাকে তারা হলো- সূচনাকারী, ব্যবহারকারী, প্রভাব বিস্তারকারী, নির্ধারণকারী, অনুমোদনকারী, ক্রেতা ও গেটকিপার।

ব্যবসায় ক্রেতার আচরণ হলো একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার পণ্য বা সেবার প্রয়োজন নির্ধারণ, মূল্যায়ন ও নির্বাচন করে থাকে। ব্যবসায় ক্রেতার আচরণ অনুধাবন করতে হলে বিপণনকারীকে সরবরাহকারীদের অবস্থা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, ক্রয় সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ ইত্যাদি ভালভাবে জানতে হয়। সাধারণত নতুন ধরনের পণ্য অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রথমবার ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা আটটি স্তর অতিক্রম করে পণ্য ক্রয় করে থাকে। সেগুলো হলো- সমস্যা শনাক্তকরণ, প্রয়োজনের বর্ণনা, পণ্য সুনির্দিষ্টকরণ, সরবরাহকারী অনুসন্ধান, প্রস্তাব সংগ্রহ, সরবরাহকারী নির্বাচন, অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরণ এবং কার্যসম্পাদন পর্যালোচনা।

১ thought on “ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রতিক্রিয়া”

Leave a Comment