বিপণন: ধারণা ও প্রতিক্রিয়া আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “বিপণন: ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিপণন: ধারণা ও প্রতিক্রিয়া
বর্তমান সময়ে প্রতিটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বিপণনের বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত। টিভিতে বা সংবাদপত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রেতাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়া বা নতুন নতুন পণ্য বাজারে সহজলভ্য হওয়া ইত্যাদি বিপণনের কাজেরই প্রতিফলন। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই বিপণনের কার্যাবলীর মাধ্যমে ক্রেতাকে আকৃষ্ট ও দীর্ঘ মেয়াদে ক্রেতা-সম্পর্ক তৈরি করতে চায়। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের পণ্য বা সেবা প্রস্তুত করে বাজারে সরবরাহ করে থাকে। মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে, তার চাহিদা মেটানোর জন্য এসব পণ্য ক্রয় ও ভোগ করে।
মানুষ খাবার ক্রয় করে ক্ষুধা নিবারণের জন্য আবার চিকিৎসকের কাছে সুস্থ হওয়ার জন্য চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে। পণ্য বা সেবা ভোগ করার জন্য মানুষ নির্দিষ্ট বাজার থেকে যাচাই-বাছাই করে তারপর প্রয়োজন অনুসারে ক্রয় ও ভোগ করে। লক্ষ করা যায় যে, পণ্য বা সেবার ধারণার সৃষ্টি থেকে শুরু করে, ক্রেতাদের মাঝে তা পরিচিতিকরণ, ক্রয়ে উৎসাহ প্রদান, পণ্য বণ্টন, মূল্য নির্ধারণ, ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা প্রদান এবং বিক্রয়োত্তর সেবাসহ বিভিন্ন কাজের সাথে বিপণন বা বাজারজাতকরণ (Marketing) জড়িত। বিপণনের সাথে উৎপাদক, ক্রেতা, ভোক্তা ও বিপণনকারী সুপ্রচলিত কিছু শব্দ।
পণ্যদ্রব্য উৎপাদনের সাথে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানিকে উৎপাদক (Producer) বলে। যেমন: জিকিউ ইন্ডাষ্ট্রি ইকোনো বল পেন উৎপাদন করে। যে ব্যক্তি বা কোম্পানি পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে তাকে ক্রেতা (Customer) বলে। নিজে ভোগ করার জন্য কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানি যদি পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে তাকে ভোক্তা (Consumer) বলে। যেমন: কোনো ব্যক্তি ইকোনো বল পেন ক্রয় করে সে যদি নিজে কলমটি ব্যবহার করে তখন সে ক্রেতা ও ভোক্তা। আবার সেই ব্যক্তি যদি কলমটি ক্রয় করে তার বন্ধুকে ব্যবহার করার জন্য দেয় তাহলে ব্যক্তিটি শুধুই ক্রেতা। অন্যদিকে তার বন্ধু ক্রেতা নয়, বরং শুধুই ভোক্তা।
কোনো বিপণনকারী (Marketer) হলো এমন ব্যক্তি যে অন্য পক্ষের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া বা সাড়া পাওয়ার আশা করে। এই প্রতিক্রিয়া হতে পারে-দৃষ্টি আকর্ষণ, ক্রয়, অনুদান বা সমর্থন ইত্যাদি। যেমন: জিকিউ ইন্ডাষ্ট্রি তার উৎপাদিত কলম বিক্রয়ের জন্য বাংলাদেশের ক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করে এবং কলম ক্রয় করার জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়ার মাধ্যমে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করে। বিপণনে ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টির (Customer Value) উপর জোড় দেওয়া হয়।
কোনো পণ্য ক্রয় ও ব্যবহার করে ক্রেতা যে উপকারিতা পায় এবং পণ্যটি অর্জনের জন্য যে অর্থ ব্যয় করে তার পার্থক্যকে ক্রেতা ভ্যালু বলে। ক্রেতা ইকোনো কলম যে মূল্যে ক্রয় করেছে সেই অনুযায়ী কলমটির ব্যবহার করতে পারলে ক্রেতার কাছে ইকোনো কলমের ভ্যালু সৃষ্টি হয়।
বিপণন কী (What is Marketing) ?
বিপণন একটি পরিবর্তনশীল ও জটিল বিষয়। অনেক সময়ই বিপণন বা মার্কেটিং দিয়ে শুধু ক্রয়-বিক্রয় বা প্রচারণাকার্যকে বোঝানো হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে, বিপণন ক্রয়-বিক্রয় বা প্রচারণা ছাড়াও পণ্যের চাহিদা নির্ধারণ, আকর্ষণীয় মোড়কীকরণ, মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন, প্রসার ইত্যাদি কাজ করে। বর্তমান সময়ে বিপণন বলতে সন্তোষজনকভাবে ক্রেতা বা ভোক্তার প্রয়োজনসমূহ পূরণকে বোঝায়। বিপণনের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতা ভ্যালু বা সুবিধা সরবরাহের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নতুন ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা এবং সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে বর্তমান ক্রেতাকে ধরে রাখা ও সন্তুষ্ট ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা।

পণ্য উৎপাদনের পূর্ব থেকে শুরু করে উৎপাদিত পণ্য ক্রেতা বা ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত বিপণন বিভিন্ন ধরনের কাজের সাথে জড়িত থাকে। বিপণনের কাজকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়; যথা: পণ্য উৎপাদনের পূর্বে, পণ্য উৎপাদনের পরে এবং পণ্য বিক্রয় করার পরবর্তীতে। পণ্য উৎপাদনের পূর্বে বিপণনের কাজগুলো হচ্ছে বাজার জরিপ, চাহিদা নির্ধারণ, অর্থ-সংস্থান, প্রতিযোগীদের চিহ্নিত করা ইত্যাদি। উৎপাদনের পরে বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মান নির্ধারণ বিভক্তিকরণ, মোড়কীকরণ, মূল্য নির্ধারণ, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বণ্টন, ঝুঁকি গ্রহণ, পণ্য প্রসার ইত্যাদি।
সর্বশেষে পণ্য ভোক্তার কাছে পৌছে দেওয়া অথবা পণ্য ভোক্তার কাছে বিক্রয় করা হলেই বিপণনের কার্যক্রম শেষ হয়ে যায় না। ভোক্তার কাছে পৌছানোর পরও বিপণনের কিছু কাজ থাকে। যেমন- বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান, ভোক্তা বা ক্রেতার সন্তুষ্টি পরিমাপ, সন্তুষ্টি বজায় রাখা এবং বৃদ্ধি করা, বিপণনের নানাবিধ কার্যক্রম মূল্যায়ন করা। সুতরাং বিপণন হচ্ছে একটি সামাজিক ও ব্যবস্থাপকীয় প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে ক্রেতাদের প্রয়োজন অনুসারে পণ্য ও সেবা তৈরি ও বিনিময় করার মাধ্যমে প্রয়োজন ও অভাব মিটিয়ে তাদের সন্তুষ্টি বিধান করা হয়।
বিপণনের গুরুত্ব ( Importance of Marketing):
বিপণন ভোক্তার প্রয়োজন অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা প্রস্তুত করে। এ জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করে। বিপণন পণ্য সরবরাহ করার সাথে অনবরত গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে সবসময় নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও পণ্যের উন্নয়ন করে। একই সাথে বিপণন ভোক্তার চাহিদা ও রুচি অনুযায়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুগোপযোগী পণ্য বা সেবা প্রস্তুত ও সরবরাহ করে ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে।
বিপণন বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে মানুষের এ সুপ্ত চাহিদাকে চিহ্নিত ও জাগ্রত করে এবং স্বত্ত্বগত, স্থানগত, সময়গত ও রূপগত উপযোগ সৃষ্টি করে সমাজে পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি করে থাকে। দেশে ও বিদেশে পণ্যের চাহিদার বিভিন্নতা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করে। বিপণন পণ্যের চাহিদা ও প্রয়োজনানুসারে সঠিক সময়ে সঠিক পণ্যটি, সঠিক স্থানে পৌছে দিয়ে পণ্যের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করে। বাজারে কোন ধরনের পণ্য প্রয়োজন, কী পরিমাণ পণ্য প্রয়োজন, কখন পণ্যটি প্রয়োজন—এ বিষয়গুলো ছাড়াও পণ্যদ্রব্যের সঠিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে বিপণন একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। সামগ্রিক বিপণন কার্যক্রমের সম্প্রসারণের সাথে সাথে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়ে থাকে।

বিপণন প্রক্রিয়া (Marketing Process):
বিপণন মানুষের প্রয়োজন ও চাহিদা পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা প্রস্তুত করে ভোক্তাদের প্রয়োজন ও সন্তুষ্টি বিধান করে থাকে। চিত্র ১.১-এ বিপণন প্রক্রিয়ায় দেখানো হয়েছে যে, পাঁচটি পর্যায়ে কীভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি ও অর্জন করতে পারে। বিপণনকারী ক্রেতা ভ্যালু ও ক্রেতা সম্পর্ক তৈরি করার জন্য প্রথমত, বাজার ও ক্রেতার কী কী প্রয়োজন ও অভাব রয়েছে তা জানার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। ক্রেতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর দ্বিতীয় পর্যায়ে, ক্রেতা ভ্যালু তৈরির জন্য বিপণন কৌশল গ্রহণ করে; তৃতীয় ধাপে, সমন্বিত বিপণন কার্যক্রম প্রস্তুত করে, এবং চতুর্থ পর্যায়ে, লাভজনক সম্পর্ক তৈরির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সর্বশেষে, ক্রেতা ভ্যালু ও ক্রেতা সম্পর্ক তৈরির বিনিময়ে বিপণনকারী মুনাফা ও ক্রেতা ইক্যুইটি অর্জন করে।
বাংলাদেশে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স

করোনাকালে বাংলাদেশে ই-কমার্সে ব্যবসা জনপ্রিয় হয়েছে। তা আগামী তিন বছরের মধ্যে ই-কমার্সের বাজার গিয়ে ৩০৯ কোটি ৭০ লাখ ডলারে দাঁড়াবে, যা দেশীয় মুদ্রায় ২৬ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার সমান। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ। তার মধ্যে ফেসবুক ব্যবহার করেন ৮৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর ফেসবুককেন্দ্রিক ব্যবসা করে প্রায় ৩ লাখ উদ্যোক্তা, যার অর্ধেকই নারী। উদ্যোক্তারা মাসে গড়ে ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা আয় করেন। তাতে সম্মিলিত বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩১২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, দেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার।
তাদের কাছ থেকে যাঁরা পণ্য কেনেন, তাঁদের মধ্যে ৮০ শতাংশই শহরাঞ্চলের বসবাস করেন। প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার অর্ডার ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। চলতি বছর ই-কমার্সের বাজারের আকার গিয়ে দাঁড়াবে ২০৭ কোটি ডলারে, যা গত বছর ছিল ১৬৪ কোটি ডলার। সেই হিসেবে এবার ই- কমার্সের বাজার বাড়বে ২৬ শতাংশ। ই-কমার্সে থেকে পণ্য কিনতে বেশি আগ্রহ দেখান ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী মানুষ। সব মিলিয়ে ই-কমার্সের ৬১ শতাংশ পণ্যের ক্রেতাই তাঁরা। তারপর ১৬ শতাংশ পণ্য কেনেন ৩৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষ। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষ কেনেন ই-কমার্সের ১৪ শতাংশ পণ্য।
এ ছাড়া ৪৫-৫৪ বছর বয়সী মানুষ ই-কমার্সের ৫ শতাংশ পণ্য কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিভিন্ন ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে অনলাইনে পোশাক বাজারের আকার ৫৯ কোটি ডলারের, যা ২০২৩ সালে ১২৪ কোটি ডলারে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে ৪৫ কোটি ডলারের ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। আসবাব ও গৃহস্থালি সরঞ্জামও বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৯ কোটি ডলারের। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষদের ই-কমার্সের আওতায় নিয়ে আসার জন্য সুলভ মূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।

সারসংক্ষেপ
বিপণন একটি পরিবর্তনশীল ও জটিল বিষয়। বিপণনের মূল উদ্দেশ্য হলো ক্রেতা ভ্যালু বা সুবিধা সরবরাহের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে নতুন ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা এবং সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে বর্তমান ক্রেতাকে ধরে রাখা ও সন্তুষ্ট ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি করা। ব্যবসায়ে বিপণনের গুরুত্ব ব্যপক। বিপণন বাজারে কোন ধরনের পণ্য প্রয়োজন, কী পরিমাণ পণ্য প্রয়োজন, কখন পণ্যটি প্রয়োজন—এ বিষয়গুলো ছাড়াও পণ্যদ্রব্যের সঠিক মূল্য নিয়ন্ত্রণ করে। বিপণন প্রক্রিয়ায় দেখানো হয়েছে যে, পাঁচটি পর্যায়ে কীভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি ও অর্জন করতে পারে।

১ thought on “বিপণন: ধারণা ও প্রতিক্রিয়া”