পণ্য ও সেবা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “পণ্য, সেবা ও ব্র্যান্ড” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।

পণ্য ও সেবা
পণ্য কী? [ What is product ? ]
ল্যাটিন শব্দ “Producer” হতে Product শব্দটি এসেছে। যার বাংলা প্রতিশব্দ হলো পণ্য। পণ্য বলতে এমন কিছুকে বোঝায় যা ভোক্তাদের নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে পূরণ করতে সাহায্য করে। পণ্য হলো, এমন কিছু যার মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তা তার নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে সন্তুষ্ট করতে পারে এবং যা ব্যবহার করে বিপণনকারী ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণ, ভবিষ্যৎ সন্তুষ্টি অর্জন এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।
Philip Kotler,
“A product is anything that can be offered to a market for attention, acquisition, use or consumption that might satisfy a want or need.”
অর্থাৎ পণ্য হলো, ভোক্তাদের মনোযোগ অধিকার লাভের জন্য বাজারের প্রাপ্ত বস্তু, যা ব্যবহার বা ভোগের মাধ্যমে ভোক্তা তার প্রয়োজন ও চাহিদা মেটাতে পারে। McCarthy বলেন,
“Product means the needs satisfying offering of a firm.”
অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিক্রয়যোগ্য ও মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণের ক্ষমতাসম্পন্ন বস্তুকে পণ্য বলে ।
পণ্য বলতে শুধু দৃশ্যমান বস্তুকেই বোঝায় না বরং পণ্যের সংজ্ঞার মধ্যে দৃশ্যমান বস্তু, সেবা, ধারণা, ব্যক্তি, স্থান, সংগঠন, ইভেন্ট, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, সম্পত্তি অথবা এগুলোর সংমিশ্রণও অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু কোনো বস্তু পণ্য হতে হলে, তার চাহিদা ও অভাব পূরণের ক্ষমতা থাকতে হবে, তাই ভোক্তাদের বস্তুগত ও অবস্তুগত অভাব মেটাতে সক্ষম এরূপ দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান বৈশিষ্ট্যের অধিকারী উপাদানই হলো পণ্য। যেমন: একজন ভোক্তা তার দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাবান, শ্যাম্পু এবং সুগন্ধি ক্রয় করল। প্রতিটি বস্তুই একেকটি পণ্য, যা দিয়ে ভোক্তা তার নির্দিষ্ট প্রয়োজনগুলো মেটাবে।

পণ্যের স্তরসমূহ [ Levels of Product ]:
নতুন পণ্য তৈরি করার পূর্বে বিপণনকারীদের সুনির্দিষ্টভাবে পণ্যের স্তরসমূহ নির্ধারণ করা প্রয়োজন । পণ্যের স্তরসমূহ বলতে পণ্যে উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপকে বোঝায় যেখানে একটি পণ্যের মূল উপযোগ থেকে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত ভোক্তা সমস্যা সমাধানের ও সন্তুষ্টি বিধানের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে উঠবে। পণ্যের স্তরকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে যা চিত্র ৬.১ এ দেখানো হয়েছে-
১. পণ্যের মূল সুবিধা (Core benefit):
মূল পণ্য বা সুবিধা বলতে পণ্যের অন্তর্নিহিত মূল বা উপকারিতা বা মূল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে বোঝায়। যেমন একজন ক্রেতা কী প্রয়োজনে একটি পণ্য ক্রয় করবে? লেখার সুবিধাটাই হলো, একটি কলমের মূল সুবিধা বা কোর বেনিফিটস। ফিলিপ কটলারের মতে, “The core benefit is the fundamental benefit or service that the customer is really buying.”
২. প্রকৃত পণ্য (Actual product):
দ্বিতীয় পর্যায়ে বিপণনকারীর কাজ হলো, মূল পণ্য সুবিধাকে ভোক্তাদের কাছে একটি দৃশ্যমান এবং ব্যবহার উপযোগীরূপে উপস্থাপন করা। ভোক্তার সন্তুটি অর্জনের জন্য এ পর্যায়ে পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মূল পণ্যের সাথে গুণগত মান, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, নকশা, ব্র্যান্ড নাম, মোড়কীকরণ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সংযুক্ত করে। যেমন: একটি কলমের লেখার সুবিধাকে ভোক্তার কাছে বিভিন্ন ডিজাইনের, মানের, রঙের এবং ব্র্যান্ড নাম দিয়ে কোম্পানি বিপণন করে।
৩. বর্ধিত পণ্য (Augmented Product):
বিপণনকারী ক্রেতাদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এই পর্যায়ে মূল ও প্রকৃত পণ্যের সাথে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা সংযোজন করে। ফিলিপ কটলারের মতে, “Augmented Product is the additional consumer service and benefits but around the actual and core product.” প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ভোক্তার চাহিদাগত পরিবর্তনের দিকে লক্ষ রেখে কোম্পানিগুলোকে সবসময় নতুন সুযোগ-সুবিধা উপস্থাপন করার চেষ্টায় থাকতে হবে। এই স্তরে শুধু পণ্যের গুণগত মানের উন্নয়নই ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যথেষ্ট নয়। ভোক্তার অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী বিপণনকারীকে সবসময় নতুন নতুন অতিরিক্ত সেবা প্রদান করতে হবে।

পণ্যের শ্রেণিবিভাগ [ Product Classification ]:
পণ্যের প্রকৃতি ও ক্রেতা একটি পণ্যকে কীভাবে দেখে এই বিবেচনায় সকল ধরনের পণ্যকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এই দুই ভাগের একটি হচ্ছে ভোগ্য পণ্য এবং অপরটি শিল্প পণ্য । ভোগ্য পণ্যকে আবার বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।
১. ভোগ্য পণ্য (Consumer Goods):
যেসব পণ্য পুনঃবিক্রয় বা কোনো রকম প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়াই সরাসরি ভোগ বা ব্যবহার করা যায়, সেগুলোকে ভোগ্য পণ্য বলা হয়। ভোক্তা বা ব্যবহারকারী এ পণ্য ক্রয় করে সরাসরি ভোগ করে থাকে। যেমন: চাল, ডাল, টুথপেস্ট, সাবান, টেলিভিশন ইত্যাদি। ব্যবহারের ভিত্তিতে ভোগ্য পণ্যকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়, যা ৬.২ চিত্রে দেখানো হলো-
ক) সুবিধাজনক পণ্য (Convenience Products):
যেসব পণ্য ভোক্তা বা ব্যবহারকারীরা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে কাছাকাছি দোকান থেকে বিশেষ তুলনামূলক বিচার না করেই ক্রয় করার চেষ্টা করে সেগুলোকে সুবিধাজনক পণ্য বলা হয়। এসব পণ্যের মূল্য সাধারণত কম থাকে এবং বিভিন্ন দোকানদার একই ধরনের অথবা প্রায় একই গুণাগুণসম্পন্ন পণ্য মজুদ করে রাখে, যেন ক্রেতা চাওয়ামাত্র বিক্রয় করতে পারে। ওষুধপত্র, কলম, সাবান, সংবাদপত্র, তাজা ফল, টুথপেস্ট ইত্যাদি। সুবিধাজনক পণ্য চার প্রকার। নিচে এদের বিবরণ দেওয়া হলো-

i) অত্যাবশকীয় পণ্য ( Staples Products ) :
অত্যাবশকীয় জাতীয় পণ্য সবসময়ই দরকারি হয় তাই ব্যবহার শেষ হবার সাথে সাথেই নতুন করে ক্রয় করার জন্য ক্রেতা সচেষ্ট হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে বা বাজেট প্রণয়ন করে। তাই এসব পণ্যকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বলা হয়। খাবার জিনিস এবং ওষুধপত্র অত্যাবশকীয় পণ্যের উদাহরণ।
ii) তাৎক্ষণিক পছন্দ পণ্য (Impulse Products):
যেসব পণ্য লোকজন বিশেষ চিন্তা-ভাবনা না করেই ঝোঁকের মাথায় ক্রয় করে থাকে সেগুলোকে তাৎক্ষণিক পছন্দ পণ্য বা লোভনীয় পণ্য বলে। এ জাতীয় পণ্য দেখামাত্রই কারো ক্রয় করতে ইচ্ছে হয় এবং পকেটে টাকা থাকলেই সাথেসাথে তা কিনে ফেলে । যেমন: ফোলানো বেলুন, সুন্দর খেলনা বা চকোলেট ।
iii) জরুরি পণ্য (Emergency Products):
সব ধরনের পণ্যই পরিস্থিতির কারণে জরুরি পণ্য হতে পারে । সেজন্য কোনো একটি বিশেষ পণ্যকে জরুরি পণ্য বলা যায় না। হঠাৎ করেই কোনো পণ্যের জরুরি দরকার হয়ে পড়লে তাকে জরুরি পণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। জরুরি পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যের প্রতি বিশেষ খেয়াল না করেই ক্রেতা তা ক্রয় করে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, একজন মোটরগাড়ির চালক ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের যাত্রাপথে হঠাৎ মোটরগাড়ির একটি টায়ার চলার অযোগ্য হয়ে পড়লে তিনি জরুরি ভিত্তিতে ২০০০ টাকা মূল্যের টায়ার ২৫০০ টাকা দিয়ে কিনতে বাধ্য হন। মোটরচালকের জন্য তখন টায়ারটি একটি জরুরি পণ্য। স্বাভাবিক সময়ে টায়ার তার জন্য জরুরি পণ্য নয়।
iv) গৃহে সরবরাহকৃত পণ্য ( Delivered Products ) :
যে সকল পণ্য ভোক্তার গৃহে সরবরাহ করা হয় সেগুলোকে গৃহে সরবরাহকৃত পণ্য বলা হয়। দুধ, সংবাদপত্র, বরফ, শাক-সবজি ইত্যাদি এ শ্রেণির পণ্যের উদাহরণ। তবু নিজস্ব সুবিধার জন্য অনেক ভোক্তাই অতিরিক্ত মূল্যে পণ্য ক্রয় করে।
খ) বিশিষ্ট পণ্য ( Specialty Products ) :
যেসব ভোগ্য পণ্যের আকর্ষণ ও চাহিদা ভোক্তাদের একটা বিশেষ দলের নিকট এতটাই জনপ্রিয় যে, তারা পণ্যগুলো লাভের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ক্রয় করতে আগ্রহী থাকে। এ জাতীয় ভোগ্য পণ্যকে বিশিষ্ট পণ্য নামে বলা হয়। বিশিষ্ট পণ্যের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, ভোক্তা এটা ক্রয় করার জন্য প্রয়োজনবোধে বিশেষ কষ্ট স্বীকার করতে রাজি থাকে এবং একান্ত নিরুপায় না হলে এর বিকল্প পণ্য ক্রয় করে না। বিশেষ ধরনের কাপড় (যথা: জিন্সের প্যান্ট পিস), উচ্চমানের ফ্যাশনেবল জুতা, দামি ও আকর্ষণীয় ডিজাইনবিশিষ্ট ঘড়ি, প্রসাধনী, বিশেষ ব্র্যান্ডের ক্যামেরা বা ফটোগ্রাফিক ফিল্ম ইত্যাদি বিশিষ্ট পণ্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
গ) শপিং পণ্য (Shopping Products):
যে সকল ভোগ্য পণ্য ক্রয় করার আগে ভোক্তা পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক বাজেট তৈরি করে, ক্রয়সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যকারণ বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এদের উপযোগিতা, গুণাগুণ, মূল্য ও স্টাইলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দোকানে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ করে ক্রয় করে, তাদের শপিং পণ্য বলে। এ ধরনের পণ্য নির্বাচনকালে ভোক্তা যথেষ্ট সময় ব্যয় করে, দরকার হলে বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে এবং প্রয়োজন মনে করলে কয়েক মাইল দূরে গিয়েও পণ্য যাচাই করতে দ্বিধাবোধ করে না। স্বর্ণ-রৌপের গহনা, আসবাবপত্র, রেডিও-টেলিভিশন, ক্যামেরা, প্রজেক্টর, রিফ্রিজারেটর, কাপড়, অটোমোবাইল ইত্যাদি শপিং পণ্যের উদাহরণ। বৈশিষ্ট্যের তারতম্য অনুসারে শপিং পণ্যকে প্রধানত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। যথা:
i) শৌখিন পণ্য (Fashion Products ) :
শৌখিনতা একধরনের স্টাইল, যা একটি বিশেষ সময়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সময়ের বিবর্তনে শৌখিনতার রূপ বদলায়, পরিবর্তিত রূপে নতুন করে আবার জনসমাজে আত্মপ্রকাশ করে। শৌখিনতার সাথে সম্পর্কিত বলেই কতিপয় ভোগ্য পণ্যকে শৌখিন পণ্য বলা হয়। যেসব পণ্য নিজস্ব বাহ্যিক চাকচিক্য, বিশিষ্টতা বা স্টাইল দ্বারা ক্রেতাকে প্রলুব্ধ করে এবং তা ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করে সেসব পণ্য শৌখিন পণ্য নামে পরিচিত। আসবাবপত্র, অলংকার, শিল্পীর আঁকা ছবি বা শিল্পকর্ম শৌখিন পণ্যের উদাহরণ।
ii) সেবা পণ্য (Service Products ) :
যেসব শপিং পণ্যের স্থায়িত্ব দীর্ঘ এবং যেগুলোর কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য মেরামত বা সার্ভিসিং প্রয়োজন হয়, সেসব পণ্যকে সেবা পণ্য বলা হয়। এ জাতীয় পণ্যের মূল্যও বেশি হয়ে থাকে। রেফ্রিজারেটর, অটোমোবাইল, রেডিও, টেলিভিশন এবং অন্যান্য গৃহসামগ্রী সেবা পণ্যের উদাহরণ।
২. শিল্প পণ্য (Industrial Goods):
যেসব পণ্য সরাসরি ভোগ না করে পুনঃবিক্রয় বা পুনঃউন্নয়নের উদ্দেশ্য ক্রয় করা হয় বা যে সকল পণ্য প্রধানত ভোগ্য পণ্য তৈরির কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হয় তাকে শিল্প পণ্য বলে। যেমন: কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, স্থাপনা, আধা প্রস্তুত পণ্য ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। ব্যবহারের ভিত্তিতে শিল্প পণ্যকে ছয়টি ভাগে বিভক্ত করা হয়। যথা:
ক) কাঁচামাল (Raw Materials):
যেসব শিল্প পণ্য চূড়ান্ত পণ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং যা সংরক্ষণ, পরিবহন বা নাড়াচাড়ার সুবিধা ব্যতীত অন্য কোনো কারণে ইতিপূর্বে প্রক্রিয়াজাত করা হয়নি সেসব পণ্যকে কাঁচামাল বলা হয়। কৃষি খামার, বন, সমুদ্র বা খনি থেকে কাঁচামাল সরাসরি পাওয়া যায়। বহু প্রকার পণ্য কাঁচামালের আওতায় পড়ে। তাই বিপণনের সুবিধার্থে এগুলোকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়; যথা (ক) কৃষিজাত কাঁচামাল; যেমন: গম, ধান, চাউল, তুলা, তামাক, শস্য, ফল, সবজি, গৃহপালিত পশু এবং পশুজাত দ্রব্য, যেমন চামড়া, ডিম ও কাঁচা দুধ ইত্যাদি এবং (খ) প্রাকৃতিক কাঁচামাল; যেমন: খনিজ দ্রব্য, ভূমি, বনজ সম্পদ ও সামুদ্রিক সম্পদ ইত্যাদি।
খ) আধা প্রস্তুত পণ্য ও যন্ত্রাংশ (Fabricating Materials and Parts ):
যেসব শিল্প পণ্য চূড়ান্ত পণ্যের অংশবিশেষে পরিণত হয় এবং কিছুটা প্রক্রিয়াজাতকরণের পর উৎপাদনে ব্যবহার করা হয় সেগুলো আধা প্রস্তুত পণ্য ও পণ্যাংশ নামে পরিচিত। কাঁচামালের ন্যায় এগুলোও পণ্য উৎপাদনের জন্য সরাসরি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু কাঁচামাল যেরূপ অবিকৃত অবস্থায় ব্যবহৃত হয়, এগুলো সেরূপ অবিকল অবস্থায় ব্যবহৃত হয় না । ব্যবহারের পূর্বেই এগুলোকে আবারও প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তার, স্টিলের পাত, লৌহদণ্ড, তন্তুজাত পণ্য (সুতা), কাগজ, সিমেন্ট ইত্যাদি আধা প্রস্তুত পণ্যের উদাহরণ। অন্যদিকে টায়ার, অটোমোবাইলের ব্যাটারি, স্পার্ক প্লাগ, রাইফেলের ব্যারেল, শার্টের বোতাম ইত্যাদি যন্ত্রাংশের উদাহরণ। এসব সামগ্রীর রূপ (Form) পরিবর্তন না করেই চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়।
গ) ভারী যন্ত্রপাতি ও সম্পত্তি (Installation):
এ জাতীয় শিল্প পণ্য খুবই বৃহৎ ও দামি হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু চূড়ান্ত পণ্যের অংশে পরিণত হয় না। ভারী যন্ত্রপাতি ও সম্পত্তি প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত: (ক) দালান ও ভূমিস্বত্ব (Building and Land Rights), যেমন: কারখানা, গুদামঘর, খুচরা দোকান, অফিস বিল্ডিং, খনি ইত্যাদি এবং (খ) প্রধান যন্ত্রপাতি (Major Equipment), যেমন: বড় বড় মেশিনারি, যথা : ডিজেল ইঞ্জিন, বয়লার, ট্রাক্টর, কাগজ প্রস্তুতের মেশিন, বৈদ্যুতিক জেনারেটর, প্রিন্টিং প্রেস, চুল্লি, রোলিং মিলস ইত্যাদি।
ঘ) আধুনিক যন্ত্রপাতি (Accessory Equipment):
আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি একধরনের শিল্প পণ্য, যা উৎপাদকদের উৎপাদন কার্যে সহায়তা করে কিন্তু পণ্যের চূড়ান্ত রূপের অংশীদার হয় না। ভারী যন্ত্রপাতির চেয়ে আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির প্রত্যাশিত আয়ু কম থাকে। টাইপরাইটার, ফাইলিং বক্স, হিসাবরক্ষণ মেশিন, ছোট লেদ মেশিন, খুচরা দোকানের ক্যাশ রেজিস্ট্রার ইত্যাদি আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতির উদাহরণ।
সহায়ক সামগ্রী (Operating Supplies ) :
যেসব শিল্প পণ্য প্রস্তুত পণ্যের উপাদানের অংশ নয় অথচ প্রতিষ্ঠানের কার্যে সহায়তা করে থাকে এমন পণ্যকে বলা হয় সহায়ক সামগ্রী। স্বল্প সময়ের মধ্যে এগুলো ব্যবহৃত হয়। এসব সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণামূলক বা মেরামতের কিংবা প্রতিষ্ঠানের কার্যে সহায়তামূলক হতে পারে। মেঝে পরিষ্কারক মোম, লুব্রিকেটিং তৈল, পেনসিল ও স্টেশনারি, তাপোৎপাদক ইন্ধন, বাথরুম পরিষ্কারের সামগ্রী, বৈদ্যুতিক বাল্ব, জানালার কাচ পরিষ্কারের জিনিসপত্র, নাট-বল্টু, ওয়েল্ডিং তার ইত্যাদি সহায়ক সামগ্রীর উদাহরণ।
চ) ব্যবসায়িক সেবা (Business Services ) :
ব্যবসায়িক সেবাকে বিপণনের ভাষায় ‘শিল্প পণ্য হিসেবে গণ্য করা হলেও এটি অবশ্যই চূড়ান্ত পণ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ (Maintenance), মেরামত জাতীয় সেবা (Repair Services) এবং ব্যবসায়িক পরামর্শমূলক সেবা (Business Advisory Services) ব্যবসায়িক সেবার অন্তর্ভুক্ত। এসব সেবা সাধারণত চুক্তি মোতাবেক প্রদান করা হয়।
সেবা কী? [ What is Services ? ]
বর্তমান যুগে বস্তুগত দৃশ্যমান পণ্যের তুলনায় অবস্তুগত এবং অদৃশ্যমান সেবার ব্যবহার বেড়েই চলছে। বিশ্বে অর্থনীতির শতকরা আশি ভাগই এখন সেবা অথবা সেবাজাত পণ্যের মুনাফা পণ্যের দ্বারা পরিচালিত। সেবা বা সার্ভিস শব্দটি ল্যাটিন শব্দ Servitium হতে এসেছে। সেবা হলো বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত কোনো কার্যাবলি বা সুযোগাদি অথবা সন্তুষ্টি যা অবস্তুগত, অদৃশ্যমান এবং মালিকানা স্বত্বহীন। অধ্যাপক ফিলিপ কটলারের ভাষায়, সেবাও একটি পণ্য, তবে তা দৃশ্যমান নয়, অদৃশ্যমান।’
আবার, ডব্লিউ জে স্টান্টনের মতে, ‘আলাদাভাবে শনাক্তযোগ্য ও অস্পর্শ যেসব কাজ অভাব মিটিয়ে সন্তুষ্টি প্রদান করে, যা সচরাচর অন্য কোনো পণ্যের সাথে সম্পৃক্ত নয় তাকে সেবা বলে।’ সেবাকে অনুভব করা যায় বা উপভোগ করা যায় কিন্তু দেখা যায় না বা স্পর্শ করা যায় না। সেবা ক্রয়-বিক্রয়ের ফলে কোনো বস্তুগত দ্রব্য বা মালিকানা হস্তান্তরিত হয় না। যেমন: শিক্ষকের জ্ঞান দান একধরনের সেবা, যার জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয় কিন্তু এতে বস্তুগত কোনো জিনিসের হাত বদল হয় না। সেবার প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্য হলো-
১. অদৃশ্যমান (Intangibility):
সেবার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর অদৃশ্যমানতা । সেবা দেখা যায় না বা ছোঁয়া যায় না, তবে অনুভব করা যায়।
২. অবিভাজ্যতা (Inseparability):
সেবার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অবিভাজ্যতা। অর্থাৎ সেবা প্রদানকারী বস্তু বা ব্যক্তিকে প্রদত্ত সেবা থেকে আলাদা করা যায় না।
৩. পরিবর্তনশীলতা (Variability):
সেবার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন সময়ে সেবার মধ্যে পরিবর্তন আসতে পারে আবার একজন ব্যক্তি বা বস্তু থেকে প্রাপ্ত সেবা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম হতে পারে। সুতরাং সেবার মান সবসময়ই পরিবর্তশীল ।
৪. মজুদ অযোগ্যতা বা পচনশীলতা (Perishability):
সেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ক্ষয়িষ্ণুতা। অর্থাৎ সেবাকে পণ্যের মতো মজুদ করে রাখা যায় না ।

সারসংক্ষেপ:
পণ্য হলো এমন কিছু যার মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তা তার নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে সন্তুষ্ট করতে পারে এবং যা ব্যবহার করে বিপণনকারী ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণ, ভবিষ্যৎ সন্তুষ্টি অর্জন এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। মূলত পণ্যের প্রকৃতি ও | ক্রেতা একটি পণ্যকে কীভাবে দেখে এই বিবেচনায় সকল ধরনের পণ্যকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যেতে পারে । এ দুই ভাগের একটি হচ্ছে ভোগ্য পণ্য এবং শিল্প পণ্য। ভোক্তা বা ব্যবহারকারীই ভোগ্য পণ্য ক্রয় করে সরাসরি ভোগ করে থাকে। ব্যবহারের ভিত্তিতে ভোগ্য পণ্যকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়।
যথা: ক) সুবিধাজনক পণ্য, খ) বিশিষ্ট পণ্য ও গ) শপিং পণ্য। অন্যদিকে যেসব পণ্য সরাসরি ভোগ না করে পুনঃবিক্রয় বা পুনঃউন্নয়নের উদ্দেশ্য ক্রয় করা হয় বা যে | সকল পণ্য প্রধানত ভোগ্য পণ্য তৈরির কাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হয় তাকে শিল্প পণ্য বলে। ইহা ছয় প্রকার। যথা: ক) কাঁচামাল, খ) আধা প্রস্তুত পণ্য ও যন্ত্রাংশ, গ) ভারী যন্ত্রপাতি ও সম্পত্তি, ঘ) আধুনিক যন্ত্রপাতি, ঙ) সহায়ক সামগ্রী এবং চ) ব্যবসায়িক সেবা। বর্তমান যুগে বস্তুগত দৃশ্যমান পণ্যের তুলনায় অবস্তুগত এবং অদৃশ্যমান সেবার ব্যবহার বেড়েই চলছে। আলাদাভাবে শনাক্তযোগ্য ও অস্পর্শ যেসব কাজ অভাব মিটিয়ে সন্তুষ্টি প্রদান করে, যা সচরাচর অন্য কোনো পণ্যের সাথে সম্পৃক্ত নয় তাকে সেবা বলে ।

১ thought on “পণ্য ও সেবা”