ব্যক্তিক বিক্রয়: প্রক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “ব্যক্তিক বিক্ৰয়” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।

ব্যক্তিক বিক্রয়: প্রক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা
ব্যক্তিক বিক্রয় হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাকে নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত করে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ে পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্রেতাসাধারণকে সরাসরি পণ্য ক্রয়ে আহ্বান জানানো হয়। এই প্রক্রিয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিয়মিত ক্রেতায় এবং নিয়মিত ক্রেতাদের স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ব্যক্তিক বিক্ৰয় থেকে যথাযথ সুফল পেতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এবং সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে অগ্রসর হতে হয়। দেশের উৎপাদিত পণ্যসমূহ বিক্রয়ের জন্য প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বিক্রয়কর্মীদের উপর নির্ভর করতে হয়।
খুব কম সংখ্যক লোকই বিক্রয়কর্মীর প্রবল প্রচেষ্টা ছাড়া জীবনবীমা পলেসি গ্রহণ করে। তবে বিক্রয় কার্যক্রমকে সফল করার জন্য একটি সুষ্ঠু ও সৃষ্টিশীল পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। ব্যক্তিক বিক্রয় হলো একটি কলা (Art) বা শিল্প। তাই এটাকে বাস্তবায়ন করার জন্য অনেক বিষয় বিবেচনা করতে হয়। যে কোন ভাবে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করলে এখান থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করা যাবে না। তাই সঠিক নিয়ম কানুন মেনে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।
ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া (Personal Selling Process):
ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া হলো কিভাবে সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করা যায় তার একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া। ব্যক্তিক বিক্রয় কার্যক্রম একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। ক্রেতাদের নিকট পণ্য বিক্রয় ও ক্রেতা সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য বিক্রয়কর্মীকে কতগুলো যৌক্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। এই ধারাবাহিক পদক্ষেপসমূহকে বলা হয় ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া। ফলপ্রসূ ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার পদক্ষেপসমূহ নিম্নে চিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ ও ব্যাখ্যা করা হলো:

১. ক্রেতা অনুসন্ধান ও যোগ্যতা যাচাই (Prospecting and qualifying):
বিক্রয় প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো ক্রেতা অন্বেষণ ও যোগ্যতা যাচাইকরণ। বিক্রয়ে সফলতা পাওয়ার জন্য সঠিক ক্রেতাকে আবেদন জানাতে হবে। বিক্রয়কর্মীকে প্রায়ই সামান্য বিক্রয়ের জন্য অনেক সম্ভাব্য ক্রেতাকে আবেদন জানাতে হয়। বিক্রয়কর্মী যাদের নিকট পণ্য বিক্রয় করতে চায় তাদের সবাই ক্রেতা নয়। সঠিক ক্রেতা নির্বাচন করতে পারলে বিক্রয়কর্মীর সময় ও শ্রম দুটোর সঠিক ব্যবহার করা যায়। যারা বর্তমানে পণ্য ক্রয় করছে না কিন্তু ভবিষ্যতে পণ্য ক্রয় করতে পারে তাদেরকে সম্ভাব্য ক্রেতা বলা হয়। আর যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে খুঁজে বের করা হয় তাকে সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ বলে।
বিক্রয়কর্মীকে সম্ভাব্য ক্রেতা নির্বাচনের জন্য প্রথমেই দেখতে হবে প্রত্যাশিত ক্রেতাদের যোগ্যতা। একজন ভাল প্রত্যাশিত ক্রেতার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। যেমন- পণ্যের চাহিদা, পণ্যের ক্রয় ক্ষমতা, অর্থ ব্যয় করার ইচ্ছা, প্রবেশযোগ্যতা, পণ্য ক্রয় দক্ষতা ইত্যাদি। এরপর বিক্রয়কর্মীদের কতগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হবে যেমন- সম্ভাব্য ক্রেতাগণ দূর্বল না সবল, সম্ভাব্য ক্রেতাদের যোগ্যতা কেমন, পণ্য ক্রয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে কিনা, ক্রেতাদের অবস্থান ও প্রকৃতি ইত্যাদি। বিক্রয়কর্মীদের সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণের জন্য প্রত্যাশিত ক্রেতা সংবাদের উৎস অনুসন্ধান করতে হয়। বিক্রেতাগণ সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে প্রত্যাশিত ক্রেতাদের সংবাদ সংগ্রহ করতে পারে।
যেমন- ক্রেতার পরিবার, ক্রেতার কর্মস্থল, প্রতিযোগী, সম্ভাব্য ক্রেতার সরবরাহকারী, বিক্রয়কর্মীর প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াও পরোক্ষভাবে বিক্রয়কর্মী ক্রেতা সংবাদ সংগ্রহ করতে পারে যেমন- শিল্প বণিক সমিতি, ডাইরেক্টরী, অফিসিয়াল রেকর্ড, সংবাদপত্র ও সাময়িকী ইত্যাদি। সবশেষে সম্ভাব্য ক্রেতাদের খুঁজে বের করার জন্য বিক্রয়কর্মী বিভিন্ন ধরণের কৌশল ব্যবহার করে যার মধ্যে সীমাহীন শেকল কৌশল রেফারেন্স পদ্ধতি, পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি, কৌশলগত জরিপ পদ্ধতি, ধীর প্রচারণা, কোম্পানির রেকর্ড ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
২. সাক্ষাৎকপূর্ব প্রস্তুতি (Pre-approach):
সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের পূর্বে বিক্রয়কর্মীকে যতদূর সম্ভব প্রতিষ্ঠান এবং এর ক্রেতা সম্পর্কে জানতে হবে। তাই সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের পূর্বে ক্রেতাসাধারণের প্রয়োজন, ক্রয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, তাদের বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার ধরণ, ক্রয় ধাঁচ ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে বিক্রয়কর্মীকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এ সকল তথ্য সংগ্রহকে বলা হয় সাক্ষাৎপূর্ব প্রস্তুতি গ্রহণ। ক্রেতা সাধারণের নিকট সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য বিক্রেতাকে যেন অপ্রস্তুত হতে না হয় তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। একজন স্বনামধন্য বিখ্যাত ব্যক্তির নিকট সাক্ষাৎ গ্রহণের পূর্বে তার নিকট সময় চেয়ে নিতে হয়।
নইলে একজন বিক্রয়কর্মীকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও তার সাথে সাক্ষাৎ গ্রহণ নাও হতে পারে। ক্রেতাসাধারণের শখ, ইচ্ছা, ভালোলাগা, পছন্দ, অপছন্দ ইত্যাদি জানা থাকলে বিক্রয়কর্মীর বিক্রয় উপস্থাপন সহজ ও সুন্দর হয়। একজন অর্জেন্টিনার সমর্থককে ব্রাজিলের গল্প দিয়ে সাক্ষাৎকার শুরু করলে সেখান থেকে ফলপ্রসূ কিছু আশা করা যাবে না। সে কারণে সম্ভাব্য ক্রেতার সাথে কিভাবে বিক্রয় সংক্রান্ত সাক্ষাৎকার উপস্থাপন করা হবে তার জন্য বিক্রয়কর্মীকে পূর্ব থেকেই একটি সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়। অজানা একজন ক্রেতার কাছে হঠাৎ করে বিক্রয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে ফলাফল ইতিবাচক নাও হতে পারে।
তাই বিক্রয় উপস্থাপনা করার পূর্বেই সম্ভাষণ, পরিচয়, ক্রেতার আগ্রহ, মনোভাব ইত্যাদি বিবেচনা করে বিক্রয়কর্মীকে বিক্রয় সাক্ষাৎকার শুরু করা প্রয়োজন। বিক্রয়কর্মীর যদি জানা থাকে যে আজকে ক্রেতার একটি দুঃখের দিন তবে সেদিন তার সাথে বিক্রয় সাক্ষাৎকার শুরু করা উচিৎ হবে না। তাই প্রত্যেকটা সাক্ষাৎকারের পূর্বে বিক্রয়কর্মীর পূর্ণ পূর্ব প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন ।
৩. সাক্ষাতের প্রস্তুতি (Approach):
ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার তৃতীয় পদক্ষেপ হলো সাক্ষাতের প্রস্তুতি গ্রহণ। ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতার সঠিক ও যথাযথ যোগাযোগ পন্থাকে সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি বলা হয়। এ পদক্ষেপে বিক্রয়কর্মীর জানা উচিৎ কিভাবে ক্রেতার সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে। বিক্রেতাকে মনে রাখতে হবে first impression is the best impression অর্থাৎ প্রথম দর্শন হলো সেরা দর্শন। ফলে প্রথম দর্শনেই ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বিক্রয়কর্মীকে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এখানে বিক্রয়কর্মী তার ব্যক্তিগত গুণাবলী প্রয়োগ করে ক্রেতাদের মন জয় করার চেষ্টা করে থাকে।
বিক্রয়কর্মীর বেশভূষা, হাসোজ্জ্বল চেহারা, সম্মোধন, আলোচনার সূত্র ইত্যাদি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিক্রয়কর্মী ক্রেতা সম্পর্কে বাড়তি কিছু তথ্য পেতে পারে। যদি বিক্রয়কর্মী তার সম্ভাব্য ক্রেতা সম্পর্কে পূর্ব তথ্য সংগ্রহ করে থাকে তবে তিনি এটাকে মূলধন করে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার সঠিক কৌশলটি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন ধরা যাক বিক্রয়কর্মীর জানা আছে তার ক্রেতা একজন খেলা পাগল মানুষ। এক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মী খেলাধুলার বিষয় নিয়ে প্রাথমিক কতাবার্তা আরম্ভ করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বিক্রয়কর্মীকে একটি ইতিবাচক বাক্য দিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতার সাথে সংলাপ শুরু করতে হবে।
প্রথম কয়েক মুহূর্তের কথাবার্তায় মোটামুটি ধারণা করা যায় ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রয় সম্ভব হবে কিনা কিংবা বিক্রয় সফল করার জন্য আরো প্রচেষ্টার প্রয়োজন হবে কিনা। তাই সাক্ষাৎ গ্রহণের সময় বিক্রেতা সম্পর্কে ক্রেতার মনে একটি স্বচ্ছ ধারণার সৃষ্টি করতে হবে, ক্রেতার প্রয়োজনীয় বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে এবং সম্ভাব্য ক্রেতার অনুভূতিকে এমনভাবে জাগ্রত করতে হবে যেন ক্রেতা বিক্রেতার প্রতি আবেগ প্রবণ হয়ে পড়ে।
৪. উপস্থাপন ও প্রদর্শন (Presentation and demonstration):
বিক্রেতা সাক্ষাতের সময় ক্রেতার ইতিবাচক সাড়া পায় তখন এই স্তরে বিক্রেতা সরাসরি পণ্য উপস্থাপন ও প্রদর্শন করে থাকে। এখানে ক্রেতার নিকট পণ্য উপস্থাপন করে ক্রেতার প্রয়োজনকে ব্যাখ্যা করা হয়। পণ্য এবং ক্রেতার চাহিদার একটি যোগসূত্র তৈরি ও তার বিবরণ প্রদান করা হয়। বিক্রয়কর্মীকে পণ্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ বর্ণনা করতে হয় এবং পণ্যের গুণাগুণ ও ব্যবহার বিধি সম্পর্কে ক্রেতাকে অবহিত করতে হয়। বিশেষ করে নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিস্তারিত বর্ণনার প্রয়োজন হয়। এই স্তরে যেহেতু ক্রেতা ও বিক্রেতা মুখোমুখি অবস্থানে থাকে সেহেতু বিক্রেতাকে ভীষণ কৌশলী হতে হয়।
উপস্থাপন এবং প্রদর্শনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন- ক্রেতার আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে, যতদূর সম্ভব দ্রুততার সাথে পণ্য উপস্থাপন করতে হবে, কোন জটিলতা ছাড়াই পণ্য প্রদর্শন করতে হবে, যথাযথ গুণাগুণ ও পরিমাণ উপস্থাপন করতে হবে, বিক্রয়কর্মী এখানে নাটকীয় ভঙ্গিমায় পণ্য প্রদর্শন করতে পারে, মানুষের আবেগকে কাজে লাগাতে হবে, পণ্য হাতে-নাতে পরীক্ষার জন্য আবেদন করতে হবে, পণ্যটি তাকে ব্যবহারের জন্য বলতে হবে ইত্যাদি। সঠিক এবং যথাযথ পণ্য উপস্থাপনার জন্য বিক্রয়কর্মী তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারে। এসকল উপস্থাপন স্টাইলগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:
ক) পূর্ব প্রস্তুতকৃত অ্যাপ্রোচ ( Conned approach):
এটি একটি পুরাতন পদ্ধতি। এ ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মী পণ্যের প্রয়োজনীয় বিবরণ সম্মিলিত একটি পাণ্ডুলিপি তৈরি করে। এটি তৈরি করার সময় সতর্কতা বজায় রাখতে হয় যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখান থেকে বাদ না পড়ে। পরে এই পাণ্ডুলিপি বিক্রয়কর্মী মুখস্থ করে এবং ক্রেতাদের নিকট উপস্থাপন করে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কর্মীদের প্রশিক্ষণের সময় এ সকল পাণ্ডুলিপি সরবরাহ করে থাকে।
খ) ফর্মুলা অ্যাপ্রোচ (Formula approach):
এই পদ্ধতিতে প্রথমে ক্রেতাদের প্রাথমিক চাহিদাসমূহ নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়। চাহিদার প্রেক্ষিতে পণ্য সম্পর্কে ক্রেতার মনোভাব পরিমাপ করা হয়। পরে প্রয়োজনীয় পণ্যটি কিভাবে ক্রেতার চাহিদাকে পূরণ করতে পারে এবং পণ্যটি কিভাবে ক্রেতা সন্তুষ্টিতে অবদান রাখবে তা ফরমূলা উপস্থাপনের মাধ্যমে বলা হয় ।
গ) নিড সন্তুষ্টি অ্যাপ্রোচ (Need satisfaction approach) :
এই পদ্ধতিতে প্রথমে ক্রেতার নিড অনুসন্ধান ও সৃষ্টি করা হয় এবং পরবর্তীতে ক্রেতার সন্তুষ্টি বিধান করা হয় । সাধারণত দুই ধরণের প্রদর্শন দেখা যায়। প্রথমত পণ্য বিক্রয়ের পূর্বে প্রদর্শন যেমন- জুতা ক্রয় করার সময় বিক্রেতা জুতা পরিয়ে পণ্য প্রদর্শন করে থাকে। দ্বিতীয়ত পণ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে পণ্য প্রদর্শন করা হয়।
যেমন- অগ্নিরোধী বা পানিরোধী পোশাক বা আসবাবপত্র ইত্যাদি। অনেক সময় যে সকল পণ্যের প্রদর্শন সম্ভব হয় না সেক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মী পণ্য পরীক্ষার ফলাফল, পণ্য জরিপের ফলাফল ইত্যাদি প্রদর্শন করে থাকে। আবার মূল্য প্রদর্শনের জন্য বিক্রেতাগণ ক্রয় ভাউচার প্রদর্শন করে থাকে। ফলে পণ্য উপস্থাপনের সাথে সাথে পণ্য প্রদর্শন ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
৫. অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণ (Handling objections) :
পণ্য সঠিকভাবে উপস্থাপিত এবং প্রদর্শিত হওয়ার পরের স্তর হলো সঠিক ভাবে বিক্রয়কালীন অভিযোগ বা আপত্তির নিষ্পত্তিকরণ। পণ্য ক্রয়ের পূর্বে ক্রেতারা পণ্য বা সেবা নিয়ে বিভিন্ন ধরণের আপত্তি বা অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে। বিক্রয়কর্মীদের এ অভিযোগগুলো বৈধ সহকারে শুনে তা সমাধানের প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এটা এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে ক্রেতার নিকট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন ধরণের অভিযোগসমূহের সুষ্ঠু সমাধান দেয়া হয়। তবে অভিযোগ উপস্থাপনের সাথে সাথেই এটার সমাধান করতে হবে নইলে ক্রেতার মনে পণ্য সম্পর্কে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিভিন্ন কারণে ক্রেতারা এই অভিযোগসমূহ উত্থাপন করতে পারে।
যেমন- বিক্রেতার আচরণ মনঃপুত না হলে অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে, পণ্য সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে, অনেক সময় বিক্রেতার উপস্থাপনায় ক্রেতা সন্তুষ্ট না হয়ে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে, বিক্রয়কর্মীর জ্ঞান ও বুদ্ধিকে পরীক্ষা করার জন্য হতে পারে, অনেক সময় বিক্রয়কর্মীর প্রতারণামূলক আচরণ লক্ষ্য করলে ক্রেতা অভিযোগ উত্থাপন করে, অনেক সময় ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করতে না চাইলে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে, আবার ক্রেতার নিকট প্রয়োজনীয় অর্থ, সময় বা পণ্যের মূল্য কমানোর জন্য অভিযোগ উত্থাপিত হতে পারে। তবে এ সকল উত্থাপিত অভিযোগসমূহকে দুইটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে।
প্রথমত, যৌক্তিক অভিযোগ— যে সকল অভিযোগের পক্ষে জোরালো যুক্তি থাকে, যেমন- পণ্যের গুণাগুণ, পণ্যের মূল্য, পণ্যের স্থায়িত্ব ইত্যাদি বিষয়ে। এসকল অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণে বিক্রয়কর্মীকে যৌক্তিক পর্যায় বিষয়গুলো তুলে ধরতে হয়। দ্বিতীয়ত, অযৌক্তিক অভিযোগ— যে সকল অভিযোগের পক্ষে কোন জোরালো যুক্তি থাকে না বরং এগুলো আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যেমন- বিক্রয়কর্মীর অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, প্রত্যক্ষণ, উপস্থাপন ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন হতে পারে । আবার অনেক সময় ক্রেতাগণ কিছু অজুহাত (excuses) সৃষ্টি করে পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে পারে।
যেমন- এখন আমার পণ্য ক্রয়ের সময় নাই পরে ক্রয় করবো, আমি আমার বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে পণ্যটি ক্রয় করবো ইত্যাদি যা আসলে পণ্য ক্রয়কে এড়ানোর জন্য উত্থাপন করা হয়ে থাকে । পরিশেষে বলা যায় অভিযোগ যৌক্তিক বা অযৌক্তিক সেটা বিবেচনা না করে উত্থাপিত অভিযোগসমূহকে যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। এজন্য বিক্রয়কর্মীর পূর্ব প্রস্তুতি থাকতে হবে এবং কিছু বিষয়ে যত্নশীল হতে হবে।
যেমন- অভিযোগের বিষয়সমূহ চিহ্নিত করতে হবে, ক্রেতাদের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে বন্ধুত্বসুলভ আচরণের মাধ্যমে আলোচনা করতে হবে, উত্তেজনা বা বাদানুবাদ পরিহার করতে হবে, তাদের বক্তব্য মনোযোগ সহকারে শ্রবণ ও গুরুত্ব প্রদান এবং পরিশেষে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ। বিশেষ করে পণ্য সম্পর্কে নিশ্চয়তা প্রদান ক্রেতার আপত্তি দূরীভূতকরণে যথেষ্ট সাহায্য করে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আপত্তির সকল নিষ্পত্তি শেষ পর্যন্ত সফল বিক্রয় কার্যক্রমে পরিণত হয় ।
৬. বিক্রয় কার্য সম্পাদন (Closing sales):
সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ থেকে শুরু করে ক্রেতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি পর্যন্ত সকল কার্যক্রম সঠিকভাবে সম্পাদন করতে পারলে এই স্তরে বিক্রেতা তার চূড়ান্ত বিক্রয়কর্ম সম্পন্ন করে। একজন বিক্রয়কর্মীর সফলতা নির্ভর করে সফল বিক্রয় সম্পন্ন করার উপরেই। কেবলমাত্র সফল বিক্রয় সম্পন্ন করার জন্যই বিক্রয়কর্মী তার সকল শ্রম, সময় ও চেষ্টা বিনিয়োগ করে। ক্রেতা পণ্য ক্রয়ে সম্মতি প্রদান করলেই বিক্রয়কার্য সম্পাদন শুরু হয়। বিক্রয় কার্য সম্পাদনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো এখনই পণ্য ক্রয় করো পরে নয়। এই স্তরে সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করা হয়। বিক্রয় সম্পন্নকরণের সময় কিছু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়ে থাকে।
এ সকল প্রতিবন্ধকতাগুলো বিক্রয়কর্মীকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। যেমন- পণ্য বিক্রয়ের সময় বিক্রেতা যদি হঠাৎ কোন বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়ে তবে ক্রেতা পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে পারে। বিক্রয়কর্মী অহেতুক অতিরিক্ত কথা বলা বেশি চাটুকারীকতার চেষ্টা করলে ক্রেতা পণ্য ক্রয় না করে চলে যেতে পারে। বিক্রেতা যদি ভুল পণ্য উপস্থাপন ও প্রদর্শন করে তবে বিক্রয় সম্পন্নকরণে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিক্রয় সম্পন্নকরণের দ্বার প্রান্তে বিক্রয়কর্মী মুখ ফসকে কোন বেফাস কথা বললে ক্রেতা পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে পারে। তাই বিক্রয় সম্পন্ন করার সময় এ সকল বিষয়সমূহ বিক্রয়কর্মীকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
বিক্রয়বিদ্যায় বলা হয়ে থাকে সফল বিক্রয় হলো প্রতিটি বিক্রয়কর্মীর জন্য অম্ল পরীক্ষা (aced test)। অর্থাৎ সফল বিক্রয় হলো একজন বিক্রয়কর্মীর চরমতম পুরস্কার। এই স্তরে বিক্রয়কর্মী সকল ক্রেতার সাথে সকল লেনদেন সমাপ্ত করে বিক্রয় চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। এখানে বিক্রেতাকে মনে রাখতে হবে কোন মতে একবার ক্রেতার কাছে করতে আসে এবং অন্যদের পণ্য ক্রয় করতে উদ্বুদ্ধ করে। বিক্রেতার প্রচেষ্টা থাকবে যেভাবে হউক ক্রেতাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তোলা ।
৭. অনুক্রমণ (Follow-up):
ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার সর্বশেষ পদক্ষেপ হলো অনুক্রমণ। বিক্রয়কর্মী যদি ক্রেতা সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে চায় এবং পুনরায় ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী করতে চায় তাহলে পণ্য বিক্রয়ের পর অনুক্রমণ পর্যবেক্ষণ ও ক্রেতা মূল্যায়ণ করতে হয়। আসলে বর্তমান বিক্রয়বিদ্যায় বলা হয় পণ্য বিক্রয় সম্পন্নকরণের পর প্রকৃত বিক্রয় সম্পন্ন হয় না। প্রকৃত বিক্রয় কার্যক্রমকে গতিশীল করার জন্য পণ্য বিক্রয়ের পর বিক্রয়কর্মীকে আরো কিছু কার্যক্রম হাতে নিতে হয়। যেমন- বিক্রেতা পণ্য বিক্রয়ের পর পণ্যের কার্যক্ষমতা নিয়ে ক্রেতাদের মতামত সংগ্রহ করা বিক্রয়কর্মীর গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এছাড়া পণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান বিষয়টি ক্রেতাদের নিশ্চিত করতে হবে।
এর ফলে বিক্রেতার প্রতি ক্রেতার আস্থা সৃষ্টি হয় এবং ক্রেতা নিজে পুনরায় পণ্য ক্রয় করতে আগ্ৰহ প্ৰকাশ করে এবং অন্য ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে পরামর্শ প্রদান করে। এ কার্যক্রম হলো নিয়মিত যোগাযোগ পদ্ধতি যেখানে পণ্যটি ব্যবহারকালে সম্ভাব্য সকল ধরণের সমস্যা মোকাবেলায় সর্বোতভাবে সহায়তা দানের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হয়। বর্তমানে প্রযুক্তির যুগে মোবাইল বা টেলিফোনের মাধ্যমে অনুক্রমণ বা ফলো-আপ একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সহজেই বিক্রয় কার্যক্রমের মূল্যায়ন করা যায়। প্রকৃতপক্ষে বিক্রয়কর্মীকে বিক্রয় কার্যক্রমের সকল পদক্ষেপসমূহ মূল্যায়ন ও অনুবর্তন করতে হয়। যদি এই প্রক্রিয়ার কোথাও কোন ভুলত্রুটি দেখা দেয় তবে তৎক্ষনাত তা সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সফল বিক্রয় কার্য সম্পাদনের জন্য বিক্রয়কর্মীকে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ দক্ষতার সাথে অতিক্রম করতে হবে। যে বিক্রয়কর্মী যত দক্ষতার সাথে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে তার পক্ষে সফলতা অর্জন তত সহজ হবে।

ব্যক্তিক বিক্রয়ের সীমাবদ্ধতা ( Limitations of Personal Selling):
বিগত পাঠে ব্যক্তিক বিক্রয়ের বিভিন্ন ধরণের সুবিধা আলোচনা করা হয়েছে। ব্যক্তিক বিক্রয়কে বিপণন প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বাস্তবে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে নানা ধরণের সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। ব্যক্তিক বিক্রয়ের সীমাবদ্ধতাসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. ব্যয়বহুল (Expensive ) :
বিপণন প্রসারের যতগুলো হাতিয়ার রয়েছে তার মধ্যে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া সবচেয়ে ব্যয়বহুল কার্যক্রম। বিশেষ করে যারা নিয়মিত বিক্রয়কর্মী তাদের জন্য প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসে ব্যাপক অর্থ খরচ করতে হয়। যদি বিক্রয়ের পরিমাণ কম হয় তবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি একক খরচ বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া বিক্রয়কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। ব্যক্তিক বিক্রয়ের খরচসমূহ মূলত স্থায়ী খরচ।
অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে যেমন একটা মুনাফা পেয়ে থাকে সেভাবে ব্যক্তিক বিক্রয়ে অনেক বিনিয়োগ করে মুনাফা বা লাভ করার কথা সঠিক ভাবে বলতে পারে না। কারণ এখানে মানবিক আচরণ নিয়ে কাজ করা হয় ফলে অনেক বিনিয়োগ করে প্রতিষ্ঠান তার প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করতে পারে না। সার্বিকভাবে বলা যায় ব্যক্তিক বিক্রয় একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিপণন প্রসার পদ্ধতি।
২. সীমিত যোগাযোগ (Limited Communication):
বিপণন প্রসারের অন্যান্য মাধ্যমগুলো ব্যাপক সংখ্যক মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ব্যক্তিক বিক্রয়ের মাধ্যমে সীমিত সংখ্যক মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় প্রসার, প্রচার ইত্যাদি কৌশলসমূহ ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্রেতাদের কাছে তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব। যেহেতু ব্যক্তিক বিক্রয় একটি ব্যক্তিক উপস্থাপন সেহেতু এখানে অল্প সংখ্যক মানুষকে তথ্য প্রদান করা সম্ভব। একজন বিক্রয়কর্মী হয়তো একদিনে ৫০ জন মানুষের কাছে তথ্য প্রেরণ করতে সক্ষম। একজন বিক্রয়কর্মী নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে যার ফলে অনেক গ্রাহকের সাথে একটি নির্দিষ্ট সময়ে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় না।
৩. যোগ্য বিক্রয়কর্মীর অভাব (Lack of efficient salesman) :
একজন সফল বিক্রয়কর্মীর অনেক ধরণের গুণাবলী থাকা আবশ্যক । এসকল গুণাবলী সম্মিলিত বিক্রয়কর্মী সংগ্রহ করা খুব কঠিন বিষয়। আবার সকল ধরণের বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একই প্রকৃতির বিক্রয়কর্মীর প্রয়োজন হয় না। একজন জীবন বীমার বিক্রয়কর্মীর সাথে ঔষধ কোম্পানির বিক্রয়কর্মীর অনেক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। আবার ভোগ্য পণ্যের বিক্রয়কর্মীদের সাথে শিল্প পণ্যের বিক্রয়কর্মীদের বিস্তর পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তাই দেখা যায়, বিক্রয়কর্মীদের কার্যক্রমের উপর ভিত্তি করে বিক্রয়কর্মীদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। অন্যদিকে অন্যান্য পেশার চাইতে বিক্রয় পেশা অনেক কম আকর্ষণীয়।
ফলে ভাল গুণাগুণ সম্পন্ন বিক্রয়কর্মী সংগ্রহ করা প্রায় ক্ষেত্রেই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। আবার কিছু ভালো যোগ্যতাসম্পন্ন বিক্রয়কর্মী পাওয়া গেলেও তাদেরকে অনেক উচ্চ বেতন প্রদান করতে হয়। ফলে যোগ্যতা সম্পন্ন বিক্রয়কর্মী সংগ্রহ করা ব্যক্তিক বিক্রয়ের একটি বড় সীমাবদ্ধতা।
৪. চাকুরী ত্যাগের প্রবণতা (Tendency to quit the job):
বিক্রয়কর্মীদের কার্যক্রম এবং দায়িত্ব কর্তব্য অন্যান্য পেশা থেকে কিছুটা ভিন্ন। বিক্রয়কর্মীকে বিক্রয় কাজের জন্য সর্বক্ষণ ঘরের বাইরে থাকতে হয়। ফলে তারা পারিবারিক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিক্রয়কর্মীদের পরিবার অন্যান্য পরিবারের চেয়ে অধিক অসুবিধার সম্মুক্ষীন হয়। বিক্রয় কার্যক্রমে অন্যান্য পেশার চেয়ে বিক্রয়কর্মীকে অনেক বেশি সময় ও শ্রম দিতে হয়।
যার কারণে ব্যক্তিগত আমোদ ও বিনোদনের বিষয়টি বিক্রয়কর্মীদের অনেকটা উপেক্ষিত থাকে। প্রায় সময় আমাদের দেশের বিভিন্ন পেশার মানুষেরা বিক্রয়কর্মীদের সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যে কারণে অনেক বেকার যুবক মন্দের ভাল হিসেবে বিক্রয় পেশায় নিয়োজিত হয়। তবে অন্য পেশায় যদি কোন ধরণের সুযোগ সৃষ্টি হয় তবে সাথে সাথে চাকুরী ত্যাগ করে চলে যায়। ফলে এই পেশায় চাকুরী ত্যাগের একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
৫. ক্রেতাদের অনুগত্যতা (Buyer loyalty) :
ব্যক্তিক বিক্রয়ের ফলে ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিছু কিছু ক্রেতা রয়েছে তার নির্দিষ্ট বিক্রয়কর্মী ছাড়া পণ্য বা সেবা গ্রহণ করতে চায় না। যে কারণে ক্রেতারা নির্দিষ্ট বিক্রেতার কাছ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করে থাকে। অনেকে নির্দিষ্ট দোকান ছাড়া চুল কাটে না বা নির্দিষ্ট হোটেল ছাড়া খাদ্য গ্রহণ করে না।
যখন কোন বিক্রয়কর্মী এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যায় তখন অনেক ক্রেতা পূর্বের দোকান থেকে পণ্য ক্রয় বন্ধ করে এবং তাদের অনুগত বিক্রয়কর্মীর নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করে। ফলে বিক্রেতা শুধু নিজে চলে যায় না সঙ্গে অনেক ক্রেতাকে নিয়ে চলে আসে। সে কারণে পূর্বের প্রতিষ্ঠানটি ভিষণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেক কোম্পানি অভিজ্ঞ ও দক্ষ বিক্রয়কর্মীদের অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ বেতনে নিজের প্রতিষ্ঠানে নিয়ে আসে।
৬. প্রশাসনিক সমস্যা (Administrative problems) :
নৈর্ব্যক্তিক বিক্রয়ের চেয়ে ব্যক্তিক বিক্রয়ে অনেক ধরণের প্রশাসনিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। বিক্রয়কর্মীদের জন্য পরিকল্পনা, নির্দেশনা, প্রেষণা প্রদান, মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরণের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। ব্যক্তিক বিক্রয়কে সফল করার জন্য বিক্রয়কর্মীদের সুশৃঙ্খল প্রশিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োজন হয়। প্রশিক্ষণের পর সকল বিক্রয়কর্মীর কার্যক্রম এক রকম হয় না। আবার দক্ষ বিক্রয়কর্মী অন্যত্র চলে যেতে পারে। ফলে আবার নতুন বিক্রয়কর্মী নির্বাচন ও তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানকে জটিল প্রশাসনিক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়।
অনেক সময় বিভিন্ন ক্রেতাদের আচরণের উপর ভিত্তি করে নতুন নতুন ব্যক্তিক বিক্রয় কৌশল নির্ধারণ করতে হয় যা সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ৭. বিক্রেতার ভিন্ন আচরণ (Varied behavior of salespeople ) : বিক্রয় কার্যক্রমে ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে একটি গভীর সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের জন্য বিক্রেতাদের উপর ভিষণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় বিক্রয়কর্মীগণ সকল ক্রেতাকে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করে না। কোন কোন সময় বিক্রেতার একজন ক্রেতার সামনে অন্য ক্রেতাকে সমানভাবে গুরুত্ব প্রদান করছে না । এতে ক্রেতাগণ অপমাণিত বোধ করে। ফলে তারা অন্য বিক্রেতার নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হয়।
অনেক সময় ক্রেতাদের সাথে বিক্রয়কর্মীগণ দুর্ব্যবহার করে থাকে। আবার অনেক সময় বিক্রয়কর্মীগণ ক্রেতাদের আন্তরিকতার সাথে গ্রহণ করে না এবং কর্ম সম্পাদনে গাফলতি প্রকাশ করে। এ সকল কারণে ক্রেতারা পণ্য ক্রয় থেকে বিরত থাকতে পারে এবং অন্য বিক্রয়কর্মীর নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করা শুরু করতে পারে ।
৮. অন্যান্য (Others) :
উল্লেখিত বিষয় ছাড়াও ব্যক্তিক বিক্রয়ের আরো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন- বিক্রয়কর্মীদের নেতিবাচক মনোভাব ও প্রত্যক্ষণ ক্রেতাদের পণ্য ক্রয় থেকে বিরত রাখতে পারে। বিক্রেতাগণ অনেক সময় জোর করে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে বাধ্য করে যা ক্রেতার মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সে পুনরায় ঐ বিক্রেতার নিকট পণ্য ক্রয় করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। অনেক সময় বিক্রেতা অমূলক গল্প তৈরি করে যা থেকে ক্রেতার মনে বিক্রেতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। আবার বিভিন্ন প্রসার মাধ্যমের সাথে সমন্বয়হীনতার কারণে বিক্রয়কর্মীদের সাথে ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
বিজ্ঞাপনের ঘোষণাকৃত বিষয়সমূহ বিক্রয়কর্মী বাস্তবায়ন না করে ক্রেতাদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যেতে পারে। বিক্রয়কর্মীগণ কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম কানুন উপেক্ষা করে নিজের মত করে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায় যার ফলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হয়ে থাকে। এ জাতীয় অনেক বিষয় আছে যার কারণে ব্যক্তিক বিক্রয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে।

সারসংক্ষেপঃ
বিক্রয় প্রক্রিয়া একটি চলমান কার্যক্রম। ব্যক্তিক বিক্রয় কার্যক্রম একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। কতগুলো ধারাবাহিক পদক্ষেপসমূহকে বলা হয় ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া। ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার প্রধান পদক্ষেপ হলো ক্রেতা অনুসন্ধান ও যোগ্যতা যাচাইকরণ। সম্ভাব্য ক্রেতাদের বিভিন্ন উৎস থেকে খুঁজে বের করা এবং তাদের যোগ্যতা যাচাই করা। এরপর ক্রেতার সাথে সরাসরি কথা বলার পূর্বে ক্রেতাসাধারণের প্রয়োজন, ক্রয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ, তাদের বৈশিষ্ট্য ও চাহিদার ধরণ, ক্রয় ধাঁচ ইত্যাদি বিষয়ে বিক্রয়কর্মীকে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বিক্রয় সাক্ষাৎকার গ্রহণের পূর্বেই বিক্রয়কর্মীকে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
এরপর বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের সাথে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার শুরু করবে। এখানে বিক্রয়কর্মী তার ব্যক্তিগত গুণাবলী প্রয়োগ করে ক্রেতাদের মন জয় করার চেষ্টা করে থাকে। সাক্ষাতের সময় যদি বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের ইতিবাচক সাড়া বুঝতে পারে তখন সে পণ্যটি ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপন ও ক্রেতার প্রয়োজনকে ব্যাখ্যা করবে। এখানে ক্রেতাদের আবেগকে কাজে লাগানোর জন্য বিক্রয়কর্মী বিভিন্ন ধরণের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। এর পর বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করে। পণ্য ক্রয়ের পূর্বেই ক্রেতারা পণ্য সম্পর্কে বিভিন্ন রকম অভিযোগ উত্থাপন করে থাকে। বিক্রয়কর্মীকে এ অভিযোগগুলো ধৈর্য্যসহকারে শুনে তা সমাধানের প্রচেষ্টা চালাতে হয়।
ক্রেতা অন্বেষণ থেকে অভিযোগ নিষ্পত্তি পর্যন্ত সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন | করতে পারলে সেই বিক্রয়কর্মীকে সফল বলে গণ্য করা হবে। পণ্য বিক্রয়ের পর পুনরায় পণ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ আসতে পারে। সে সকল অভিযোগগুলোর সঠিক সমাধানের মাধ্যমে ক্রেতাদের যথাযথ বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করতে হয়। পরিশেষে বিক্রয়কর্মী যদি ক্রেতা সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে চায় তবে বিক্রয়ের পর অনুক্রমণ, পর্যবেক্ষণ ও ক্রেতা মূল্যায়ন করতে হয়।
অনুক্রমণের মাধ্যমে ক্রেতা এবং বিক্রয়কর্মীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ব্যক্তিক বিক্রয়ের বিভিন্ন ধরণের সুবিধা থাকলেও এই প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়নে অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। যেমন- এই প্রক্রিয়াটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিষয়, এখানে সীমিত সংখ্যক গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব, সবক্ষেত্রে যোগ্য বিক্রয়কর্মী পাওয়া যায় না, এখানে চাকুরী ত্যাগের একটা প্রবণতা দেখা দেয়, কিছু প্রশাসনিক সমস্যা ব্যক্তিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইত্যাদি।

১ thought on “ব্যক্তিক বিক্রয়: প্রক্রিয়া ও সীমাবদ্ধতা”