প্রণালি আচরণ ও সংগঠন আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “বিপণন বা বণ্টন প্রণালি, খুচরা ব্যবসায়, পাইকারী ব্যবসায়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।
প্রণালি আচরণ ও সংগঠন
সরবরাহ বা বণ্টন প্রণালি হলো কতিপয় ব্যবসায়ীর সমষ্টি, যারা অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে কাজ করে। সার্বিক প্রণালি সফলতার জন্য প্রণালি প্রতিটি পক্ষকেই সংঘবদ্ধভাবে প্রণালি উদ্দেশ্য ও মুনাফা অর্জনের জন্য কাজ করতে হয়। প্রত্যেক সদস্যই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং যেকোনো এক পক্ষের ভিন্ন আচরণ এবং ভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক কার্যাবলি সম্পূর্ণ প্রণালি সফলতার ওপর মারাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওয়ালটন কোম্পানির কাজ হলো ইলেকট্রনিকস সামগ্রী তৈরি করা এবং ভোক্তা চাহিদা সৃষ্টি এবং বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচারণামূলক কার্যাবলির ব্যবস্থা করা।
আর পরিবেশক এবং বিক্রয় শাখাগুলোর কাজ হলো পণ্যগুলো সুবিধাজনক স্থানে প্রদর্শন করা, ভোক্তার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরহ করা এবং সহায়ক অন্যান্য ভোক্তা সুবিধা দক্ষতার সাথে প্রদান করা। যখন বণ্টন প্রণালি সকল সদস্য নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে তখনই সমগ্র প্রণালির কার্যকারিতা এবং মুনাফা বৃদ্ধি পাবে।
বণ্টন প্রণালি দ্বন্দ্ব কী?
What is Channel Conflict?
বণ্টন প্রণালি সদস্যরা সর্বক্ষণ একটি জটিল আচরণিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে এবং অনেক সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রণালি সদস্যদের মাঝে প্রায়ই প্রণালি উদ্দেশ্য এবং ভূমিকা নিয়ে নিজেদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা যায়। সরবরাহ-বণ্টন প্রণালি সদস্যদের মাঝে প্রণালি উদ্দেশ্য, ভূমিকা এবং ফলাফল নিয়ে যে মতপার্থক্য দেখা দেয় তাকে সরবরাহ বা বণ্টন প্রণালি দ্বন্দ্ব হিসেবে পরিচিত। দ্বন্দ্ব মূলত সদস্যরা কে কোন কাজ করবে? কী উদ্দেশ্যে করবে? এবং নিজস্ব কার্যাবলির মূল্য কী হবে? ইত্যাদি নিয়েই সৃষ্টি হয় । বণ্টন প্রণালি দ্বন্দ্ব তিন প্রকারের হতে পারে-
১. উলম্ব প্রণালি দ্বন্দ্ব (Vertical Channel Conflict): এক্ষেত্রে একই প্রণালির বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীগণের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। যেমন: উৎপাদনকারীর বিক্রয় উদ্দেশ্যর সাথে খুচরা ব্যবসায়ী আথবা পরিবেশকের উদ্দেশ্যের ভিন্নতা ।
২. আনুভূমিক প্রণালি দ্বন্দ্ব (Horizontal Channel Conflict): প্রণালির একই স্তরের ব্যবসায়ীগণের মাঝে দ্বন্দ্বকে বোঝায়। যেমন: পেপসির ক্ষেত্রে নীলক্ষেতের খুচরা ব্যবসায়ী শান্তিনগরের খুচরা ব্যবসায়ীর তুলনায় কম মূল্যে কোমল পানীয় বিক্রয় করলে ঢাকার দুই এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনুভূমিক প্রণালি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
৩. বহুপ্রণালি দ্বন্দ্ব (Multi-channel Confilict): অনেক সময় একই বিপণনকারী ব্যবহৃত বিভিন্ন বণ্টন প্রণালির মাঝে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। যেমন: একই বাজারে বিপণনকারী প্রত্যক্ষভাবে এবং পরিবেশক বা ডিলারের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। এক্ষেত্রে বিপণনকারীর সাথে পরিবেশকের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে।
প্রণালি সংগঠন
Channel Organization
বণ্টন প্রণালির সদস্যদের মাঝে দ্বন্দ্ব নিরসনে এবং প্রণালির সর্বোচ্চ মুনাফা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বিপণনকারীকে সব সদস্যের ভূমিকা এবং কার্যাবলি সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো এক পক্ষকে প্রণালি নেতা বা দলনেতা হিসেবে নির্বাচিত করে প্রত্যেকের ভূমিকা এবং কার্যাবলির দিক নির্দেশনা প্রদানের দ্বায়িত্বে নিয়োজিত করাই সবচেয়ে উত্তম উপায়।
কারণ অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং দ্বন্দ্ব শুধু অল্প সময়ের জন্য ব্যক্তিক মুনাফা বৃদ্ধি করলেও ভবিষ্যতের জন্য সুফল বয়ে আনে না। বণ্টন প্রণালির কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রথাগত সাধারণ প্রণালি সংগঠনের বাইরে নতুন ধরনের প্রণালি সংগঠন সৃষ্টি করতে হবে। এক্ষেত্রে উলম্ব বিপণন পদ্ধতি, আনুভূমিক বিপণন পদ্ধতি অথবা বহুজাতিক বিপণন পদ্ধতি অধিক কার্যকর।
১. উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Vertical Marketing System): উলম্ব বিপণন পদ্ধতিতে বণ্টন প্রণালির সব সদস্য একসাথে সংঘবদ্ধ হয়ে একটি দলগত প্রচেষ্টা হিসেবে কাজ করে। প্রথাগত বণ্টন প্রণালিতে (Conventional distribution channel) এক বা একাধিক স্বাধীন মধ্যস্থ ব্যবসায়ী অবস্থান করে এবং প্রত্যেকেই স্বীয় মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে কাজ করে। অন্যদিকে উলম্ব বিপণন ব্যবস্থায় সবাই একই উদ্দেশ্যে প্রণালি মুনাফা সর্বাধিকরণ এবং নিজেদের মধ্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে কোনো এক পক্ষের নিয়ন্ত্রণের ওপর আনুগত্য প্রকাশ করে। নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে বিপণনকারী, পরিবেশক, খুচরা ব্যবসায়ী বা ভোক্তাও ভূমিকা পালন করতে পারে।
এক্ষেত্রে বিপণন প্রণালি সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত যেমন পণ্য পরিবহন, বিজ্ঞাপন, প্রদর্শন এবং প্রত্যেক সদস্যর ভূমিকা ও কার্যাবলি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী থেকে ঠিক করা হয়। যেমন: সুপারশপগুলো খুচরা ব্যবসায়ী হলেও বিভিন্ন ভোগ্য পণ্যের বিপণন প্রণালিকে আয়তনের কারণে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উলম্ব বিপণন পদ্ধতি তিন ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হলো—

ক) কর্পোরেট উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Corporate Vertical Marketing System): একই মালিকানায় পণ্যের উৎপাদন এবং বণ্টনের সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পাদিত হলে তাকে কর্পোরেট উলম্ব বিপণন পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দ্বন্দ্বের নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত কর্পোরেট প্রণালি ব্যবহার করে থাকে।
খ) চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Contactual Vertical Marketing System) : পণ্য উৎপাদন ও বণ্টনে নিয়োজিত বিভিন্ন স্তরের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য বণ্টনের কাজ সম্পাদন করলে তাকে চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বণ্টনকর্মীদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও দ্বন্দ্বের নিয়ন্ত্রণ করা হয়। অন্যদিকে উৎপাদন ও বণ্টন দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে অধিক পরিমাণে ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব হয়।

গ) নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Administered Vertical Marketing System): প্রতিষ্ঠানিক আয়তন এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করে উৎপাদন এবং বণ্টনের স্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলে । এক্ষেত্রে প্রভাবশালী এক বা একাধিক বণ্টন প্রণালি সদস্য নেতৃত্ব দিয়ে থাকে ।
২. আনুভূমিক বিপণন পদ্ধতি (Horizontal Marketing System): আনুভূমিক বিপণন পদ্ধতিতে বণ্টন প্রণালির একই স্তরের বিভিন্ন সদস্য সমন্বিতভাবে কাজ করে। যেমন: একই স্তরের বিভিন্ন পাইকরা সমন্বিতভাবে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করার জন্য অথবা নতুন কোনো বিপণন সুযোগ গ্রহণের জন্য একত্র হয়ে কাজ করে। দেশের বাইরে অথবা বৈদেশিক বিপণনের ক্ষেত্রে আনুভূমিক বিপণন ব্যবস্থা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বাজারের বিশেষ কোনো দক্ষতা বা সুবিধা অর্জনের জন্যও আনুভূমিকভাবে একত্র হয়।
৩. বহুজাতিক বিপণন ব্যবস্থা (Multichannel Marketing System): ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জন, অধিক ভ্যালু [ নিশ্চিতকরণ এবং ভোক্তার পরিসর বৃদ্ধি করার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান বহুজাতিক বিপণন ব্যবস্থা ব্যবহার করে । এক্ষেত্রে বিপাণনকারী একই পণ্যের সরবরাহে জন্য একই সাথে দুই বা ততোধিক বণ্টন প্রণালি ব্যবহার করে।
যেমন: প্রাণ-আরএফএল (Pran RFL) খুচরা ব্যবসায়ী, পরিবেশক এবং নিজস্ব বিক্রয় শাখার মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় ছাড়াও সরাসরি অনলাইনে othoba.com-এর মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য ভোক্তাদের নির্ধারিত স্থানে সরবরহ করে। বহুজাতিক বিপণন ব্যবস্থা ব্যবহার করে বিপণনকারী জটিল ও বৃহৎ ভোক্তা চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়। কিন্তু বিপণনকারীকে প্রতিটি বণ্টন প্রণালির উদ্দেশ্য, ভূমিকা, কার্যাবলি এবং ভোক্তা বিভ্রান্তি নিরসনের দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে। বণ্টন প্রণালিগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যতা রক্ষা করতে হবে এবং দ্বন্দ্ব সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনার দ্বারা সমাধান করতে হবে ।

সারসংক্ষেপ
বণ্টন প্রণালি সদস্যরা সর্বক্ষণ একটি জটিল আচরণিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে এবং অনেক সময় অনানুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রণালি সদস্যদের মাঝে প্রায়ই প্রণালির উদ্দেশ্য এবং ভূমিকা নিয়ে নিজেদের মাঝে মতপার্থক্য দেখা যায়। প্রণালি সদস্যদের মধ্যে যখন উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য হয় এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয় তখন তাকে প্রণালি দ্বন্দ্ব বলে। বণ্টন প্রণালি দ্বন্দ্ব তিন প্রকারের হতে পারে। যথা: উলম্ব প্রণালি দ্বন্দ্ব, আনুভূমিক প্রণালি দ্বন্দ্ব ও বহুপ্রণালি দ্বন্দ্ব। বণ্টন প্রণালির কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পাদন করার জন্য প্রথাগত সাধারণ প্রণালি সংগঠনের |
বাইরে নতুন ধরনের প্রণালি সংগঠন সৃষ্টি করতে হয়। এক্ষেত্রে উলম্ব বিপণন পদ্ধতি, আনুভূমিক বিপণন পদ্ধতি অথবা বহুজাতিক বিপণন পদ্ধতি অধিক কার্যকার। উলম্ব বিপণন পদ্ধতি তিন ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হলো-(ক) কর্পোরেট | উলম্ব বিপণন পদ্ধতি, (খ) চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বিপণন পদ্ধতি ও (গ) নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বিপণন পদ্ধতি। আনুভূমিক বিপণন পদ্ধতিতে বণ্টন প্রণালির একই স্তরের বিভিন্ন সদস্য সমন্বিতভাবে কাজ করে। বহুপ্রণালি বিপণন পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান পণ্য বিতরণ করার জন্য একই সাথে দুই বা ততোধিক বিপণন প্রণালি ব্যবহার করে ।

১ thought on “প্রণালি আচরণ ও সংগঠন”