বাজার বিভক্তিকরণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “ক্রেতা-চালিত বিপণন কৌশল” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।
বাজার বিভক্তিকরণ
যেকোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সব ধরনের ক্রেতা বা সকল ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয়, কারণ ক্রেতার বৈচিত্র্য, বিক্ষিপ্তভাবে ক্রেতার অবস্থান, ক্রয় করার ক্ষেত্রে ক্রেতার বিভিন্নতা রয়েছে। এ কারণে বিপণনকারী সেই সব নির্দিষ্ট ক্রেতার প্রতি গুরুত্বারোপ করে যাদের প্রয়োজন সর্বোৎকৃষ্টভাবে বিপণনকারী পূরণ করতে পারে। চিত্র ৫.১-এ দেখানো হয়েছে যে, বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণ ও লক্ষ্য বাজার নির্ধারণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্রেতাকে নির্বাচন করে। সেই নির্দিষ্ট ক্রেতার জন্য পরবর্তীতে পৃথকীকরণ ও বাজার অবস্থান গ্রহণ করে যথাযথ ভ্যালু প্রস্তাব নির্বাচন ও উপস্থাপন করে।
বর্তমানে প্রতিযোগিতার যুগে বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে সঠিক বিপণন কর্মকৌশল নির্ধারণ করতে পারে। ক্রেতা ও ভোক্তাদের মধ্যেকার প্রয়োজন ও সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে বাজারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। বাজার বিভক্তিকরণের পর মুনাফাযোগ্যতার ভিত্তিতে আকর্ষণীয়তা নির্ণয় করা হয় এবং সর্বশেষে বাজার অবস্থান গ্রহণ করা হয়।

বাজার বিভক্তিকরণ
Market Segmentation
সম্পূর্ণ বাজারকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভাগ করার প্রক্রিয়াকে বাজার বিভক্তিকরণ বলে। অর্থাৎ বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে একটি বৃহৎ বাজারকে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আচরণের ভিত্তিতে কয়েকটি উপবাজারে বিভক্ত করা হয়। এর ফলে বিপণনকারী সর্বাধিক দক্ষতার সাথে ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে।
Philip Kotler & Gary Armstrong বাজার বিভক্তিকরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “Market segmentation is dividing a market into smaller groups of buyers with distinct needs, characteristics or behavior who might require separate products and marketing mixes.” বাজার বিভক্তিকরণ বলতে একটি বাজারকে স্বতন্ত্র প্রয়োজন, বৈশিষ্ট্য বা আচরণের ভিত্তিতে ছোট ছোট ক্রেতা দলে ভাগ করাকে বোঝায়, যাদের পৃথক বিপণন কৌশল বা মিশ্রণের প্রয়োজন হতে পারে ।
বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে কোনো পণ্যের বাজার অথা বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতা বা ভোক্তাদের ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে। যেকোনো পণ্যের অসংখ্য ক্রেতা থাকে এবং তারা দেশে-বিদেশে, এখানে-সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে। সব ক্রেতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে না। এছাড়াও তাদের প্রয়োজন, চাহিদা এবং ক্রয়-অভ্যাসও এক রকমের নয়। ফলে পণ্যের উৎপাদক বা ব্যবসায়ীরা সকল গ্রাহকের নিকট একই উপায়ে পণ্য বিপণন করতে পারে না। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন ক্ষমতাও ভিন্ন ভিন্ন রকমের।
বাজারের বিভিন্ন অংশে একসাথে কিংবা একই পন্থায় পণ্য বিপণন করা তাদের অনেকের জন্যই কঠিন। তাই আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠানই পুরো বাজারে একসাথে প্রবেশ করে না বরং বাজারের ভিন্ন ভিন্ন অংশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। বাজারের এসব ছোট ছোট অংশকে বলা হয় বাজার অংশ (Segment)। যে বাজার অংশে ভালোভাবে পণ্য বিপণন করে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব, প্রতিষ্ঠানগুলো সে অংশেই পণ্য বাজারজাত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করে।
ভোক্তা বাজার বিভক্তিকরণের ভিত্তিসমূহ
Bases for Segmeting Consumer Markets
ভোক্তা বাজার চূড়ান্ত পণ্য যারা ভোগ করে তাদেরকে নিয়ে গঠিত। সাধারণত ভোক্তা বাজারকে চারটি ভিত্তির আলোকে বিভক্ত করা হয় তা চিত্র ৫.২-এ দেখানো হলো-

১. ভৌগোলিক বিভক্তিকরণ (Geographic Segmentation): এ ধরনের বিভক্তিকরণে বাজারকে বিভিন্ন অঞ্চল, (যেমন: উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ অঞ্চল), দেশ (ইউরোপিয়ান-জার্মানি, ইতালি; নর্থ অ্যামেরিকান-আমেরিকা, কানাডা; এশিয়া-চীন, জাপান, মালয়েশিয়া ইত্যাদি); জেলা (যেমন: ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট), শহর, গ্রাম ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়। ভৌগোলিক বিভক্তিকরণের পর বিপণনকারী একটি, কিংবা কয়েকটি কিংবা সবগুলো এলাকায় পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে। তবে বিপণনকারী সে সব অঞ্চলেই পণ্য বিপণন করে যে অঞ্চলে অবস্থানজনিত কারণে সর্বাধিক মুনাফা করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করে।
আবার প্রতিটি অঞ্চলের জন্য বিপণনকারীকে স্বতন্ত্র বিপণন কার্যক্রম নিতে হয়। কারণ প্রত্যেক অঞ্চলের ক্রেতাদের মধ্যে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্য নাও থাকতে পারে। যেমন: শহরাঞ্চলে ফাস্ট ফুড বেশি জনপ্রিয় গ্রামাঞ্চলের তুলনায়; বাংলাদেশে টাঙ্গাইল অঞ্চলের চমচম বিখ্যাত; শীতপ্রধান দেশে শীতের পোশাক সারা বছর বিক্রয় হয়।
২. জনমিতিক বিভক্তিকরণ (Demographic Segmentation) : এ পদ্ধতিতে কতগুলো জনমিতিক উপাদান; যেমন: বয়স, লিঙ্গ, আয়, পারিবারিক জীবনচক্র, পেশা, জাতীয়তা, শিক্ষা ইত্যাদির ভিত্তিতে সমগ্র বাজারকে বিভক্ত করা হয়। যেমন: হরলিকস বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের জন্য এনার্জি ড্রিংক বাজারে এনেছে। আবার এ্যাপেক্স সুজ বয়স ও লিঙ্গের ওপর ভিত্তি করে নানা ডিজাইন ও ধরনের জুতা বিপণন করছে। আয়ের ভিত্তিতে ব্যাংকসমূহ বিভিন্ন ক্রেডিট লিমিটের ক্রেডিট কার্ড অফার করে।
৩. মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ (Psychographic Segmentation): ভোক্তাদের জীবনমানের ধরন, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অবস্থান, চাল-চলন, পণ্য থেকে প্রাপ্য উপযোগের প্রত্যাশা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বাজার বিভক্তিকরণ করা হলে তাকে মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ বলা হয়। এ পদ্ধতিতে বাজার বিভক্তিকরণের ফলে ক্রেতারা একদিকে তাদের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও জীবন-মানের সাথে তাল মিলিয়ে পণ্য ক্রয় করতে পারে অন্যদিকে বিপণনকারীও দক্ষতার সাথে অধিক পরিমাণে পণ্য বিক্রয় সক্ষম হয়।
যেমন: বাংলাদেশে ক্যাটস আই ব্র্যান্ড ভোক্তার রুচি ও ব্যক্তিত্বের সাথে মিল রেখে প্রাত্যহিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনের জন্য আলাদা আলাদা পোশাক ও আনুষঙ্গিক ফ্যাশন উপকরণ ডিজাইন করে বিপণন করছে।
৪. আচরণমূলক বিভক্তিকরণ (Behavioral Segmentation) : পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আচরণের ভিত্তিতেও পণ্যের বাজার বিভক্তিকরণ করা যায়। এক্ষেত্রে আচরণের ভিত্তি বলতে পণ্যটি ভোগ করে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, পণ্যের প্রতি ভোক্তার মনোভাব, পণ্যের ব্যবহার ও পণ্য বিষয়ক জ্ঞান ইত্যাদি উপাদানকে বোঝায়।
যেমন: ভোক্তা শ্যাম্পু ক্রয় করে বিভিন্ন কারণে; কখনো খুশকি দূর করার জন্য বা ঝলমলে রেশমি চুলের জন্য বা চুলকে সুস্থ রাখার জন্য। শ্যাম্পু ব্যবহারের কারণের ওপর নির্ভর করে ভোক্তার এ বিভক্তিকে আচরণমূলক বিভক্তিকরণ বলা হয়। এছাড়াও উপলক্ষ, পণ্য ব্যবহারের হার, পণ্যের প্রতি আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জন্মদিন, বিয়ে ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজনে ক্রেতা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় করে। আবার কোনো ক্রেতা ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্যের জন্য একই ব্র্যান্ড প্রতিবার ক্রয় করে, অন্যদিকে আনুগত্য না থাকলে বিভিন্ন ব্র্যান্ড ক্রয় করে।
ব্যবসায় বাজার বিভক্তিকরণ
Segmeting Business Markets
ব্যবসায় বাজারে ক্রেতা পুনরায় সেই পণ্য বিক্রয় বা পুনঃপ্রক্রিয়ার জন্য পণ্য ক্রয় করে। ব্যবসায় বাজারের মূল লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন করা। এ কারণে ব্যবসায় বাজার ও ভোক্তা বাজার বিভক্তিকরণের ক্ষেত্রে কিছু উপাদানের মিল থাকলেও আরো কিছু উপাদান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তা নিম্নরূপ-
১. পরিচালনাবিষয়ক চলক (Operating Variables): বিক্রয়যোগ্য পণ্যটি যেখানে ব্যবহৃত হবে সেখানে প্রযুক্তির স্তর অনুযায়ী বাজারকে ভাগ করা যায়। আবার ব্যবসায় ক্ষেত্রে বিপণনকারীর পণ্যটি যেসব শিল্পে ব্যবহার করে তার ভিত্তিতে বাজারকে ভাগ করা যায়। এছাড়াও পণ্যটি ব্যবহারের হার, ক্রেতার যোগ্যতার ভিত্তিতে ব্যবসায় বাজারকে ভাগ করা যায়।
২. জনতাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ (Demographic Variables): এক্ষেত্রে বিপণনকারী শিল্পে পণ্যের ব্যবহার, বিক্রয়ের পরিমাণ, অবস্থানের ভিত্তিতে বাজারকে বিভক্ত করতে পারে। পণ্যটি যে শিল্পে ব্যবহার করা হয় তার ভিত্তিতে বাজারকে ভাগ করা যায়। আবার, বিক্রয় পরিমাণকে ভিত্তি করে বাজারকে বড় ও ছোট হিসেবে নির্ধারণ করা সম্ভব। অন্যদিকে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অবস্থানের ভিত্তিতেও বাজারকে ভাগ করা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি অবস্থান করে আবার কিছু দূরে অবস্থান করতে পারে। বিপণনকারী পণ্য পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করতে পারে।
৩. ক্রয়কার্য পদ্ধতি (Purchasing Approach): প্রতিষ্ঠান ক্রয়কার্য কীভাবে সংগঠিত হয় তার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে ভাগ করা যায়। প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীভূত ও বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতিতে ক্রয়কার্য সম্পাদন করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের শক্তি কাঠামো, সাধারণ ক্রয়নীতি, ক্রয়ের মাপকাঠি, বিদ্যমান সম্পর্কের প্রকৃতি অনুযায়ী ব্যবসায় বাজারকে ভাগ করা যায়। আবার যেকোনো ক্রয় অবস্থাকে তিন ভাগে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে; যেমন: সম্পূর্ণ নতুন ক্রয়, সংশোধনপূর্বক পুনঃক্রয় ও সরাসরি পুনঃক্রয়। এই তিন ধরনের ক্রয় অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করা যায়।
৪. পারিপার্শ্বিক উপাদান (Situational Factors): ক্রেতার নিকট পণ্যটি কতটা জরুরি, ব্যবসায় বাজারে পণ্যটির সুনির্দিষ্ট ব্যবহার, ব্যবসায় ক্রেতা কত পরিমাণে পণ্য ক্রয় করছে ইত্যাদির ভিত্তিতে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করা যায়।
৫. ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য (Personal Characteristics): শিল্প ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে নিজস্ব বিভিন্ন বিষয়ে কতটা মিল রয়েছে; ক্রেতা কতটা ঝুঁকি গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, বিক্রেতার প্রতি ব্যবসায় ক্রেতার আনুগত্য ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করা হয়।
আন্তর্জাতিক বাজার বিভক্তিকরণ
Segmeting International Markets
বিশ্বায়নের কারণে দুই বা ততোধিক দেশের মধ্যে ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হচ্ছে। ছোট-বড় অনেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে পণ্য উৎপাদন, বিপণন ইত্যাদি কাজ করছে। এ কারণে আন্তর্জাতিক বাজারও বিভক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমত, ভৌগোলিক অবস্থান (Geographic location) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাজারকে বিভক্ত করা যায়। একই ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থানকারী বাজারের মধ্যে প্রয়োজন, চাহিদা, আচরণ, রুচি, পছন্দ, ক্রয়ক্ষমতা ইত্যাদির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে।
অর্থনৈতিক উপাদান (Economic factor) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের আয়ের স্তর, ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা, জীবন ধারণের মানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। অর্থনৈতিক অবস্থা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ইত্যাদির বিভিন্নতা অনুযায়ী বাজারকে বিভক্ত করা যায়। রাজনৈতিক ও আইনগত উপাদান (Political and Legal factor) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পণ্য বা সেবা উৎপাদন ও বিপণনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আইনগত উপাদান বিভিন্নভাবে প্রভাব সৃষ্টি করে।
সরকারের ধরন, সরকারের স্থায়িত্ব, বিদেশি কোম্পানির প্রতি সরকারের মনোভাব, আর্থিক নিয়ম-কানুন, আমলাতান্ত্রিক অবস্থা ইত্যাদি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশভেদে বিভিন্ন হয় । সাংস্কৃতিক উপাদান (Cultural factor) আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন দেশের মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম, মূল্যবোধ, চিন্তাধারা, আচরণ ইত্যাদির বৈচিত্র্য অনুযায়ী বাজারকে বিভক্ত করা যায়।

কার্যকর বাজার বিভক্তিকরণের শর্তাবলি
Effective Segmentation Criteria
বিভক্ত করার বিভিন্ন উপাদান বা ভিত্তি দিয়ে বাজারকে নানাভাবে ভাগ করা যায় কিন্তু সকল বাজার বিভাগ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য যথাযথ নাও হতে পারে। কোন বাজার বিভাগটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সঠিক ও লাভজনক হবে তার জন্য বিপণনকারীকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হয়। কার্যকর বাজার বিভক্তিকরণের জন্য বিপণনকারী কতগুলো শর্তের মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে পারে। তা নিম্নরূপ-
১. উপাদানের পরিমাপযোগ্যতা (Measurability of Elements): বাজার বিভক্তিকরণের জন্য বাজারের প্রকৃতিভেদে বিবিধ প্রকার উপাদান ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। বাজারের উপাদানসমূহ অবশ্যই পরিমাপযোগ্য হওয়া আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ জেলা, বয়স, আয় ইত্যাদি পরিমাপযোগ্য উপাদান। তাই ঢাকা জেলায় কতজন শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে, প্রাপ্তবয়স্করা কোন পেশায়, কত আয় করছেন ইত্যাদি উপাদান পরিমাপ করা যায়। বাজার বিভাজনে ব্যবহৃত উপাদানসূহ পরিমাপযোগ্য না হলে বিভক্তিকরণের আসল উদ্দেশ্য সফল নাও হতে পারে ।
২. প্রবেশযোগ্যতা (Accessibility): বিপণনকারীকে বাজারে প্রবেশযোগ্যতা পরিমাপ করতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে খুব সহজে প্রবেশ করা যায়; আবার কিছু বাজারে প্রবেশ করা ততটা সহজ নয়। যেমন: ঢাকা শহরের ব্যবসায়ীর কাছে ঢাকার যেকোনো এলাকার বাজারে প্রবেশ করা যতটা সহজ, সেন্টমার্টিনের বাজারে প্রবেশ ততটা সহজ নয়। তাই প্রতিষ্ঠানকে বণ্টন প্রণালি, বিজ্ঞাপন মাধ্যম, বিক্রয় প্রয়াস ইত্যাদি কম খরচে, স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে এবং কম অপচয়ে প্রতিটি উপবাজার প্রবেশযোগ্য কিনা তা বিশ্লেষণ করতে হয়।
৩. কার্যোপযোগিতা (Actionability): প্রতিটি উপবাজারকে আকর্ষণীয় করার এবং সেবা প্রদানের জন্য কার্যকর প্রোগ্রাম তৈরির সামর্থ্য বিবেচনা করতে হয়। বাজার আকর্ষণীয় হলেও কার্যকরভাবে বিপণন কৌশল অবলম্বন করার ওপর নির্ভর করছে প্রতিষ্ঠানের কার্যোপযোগিতা।
৪. পর্যাপ্ততা (Substantiality): বিভক্তিকরণের মাধ্যমে যেসব উপবাজার সৃষ্টি করা হয় সেগুলো যুক্তিসংগতভাবে বৃহৎ হওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্রাকারের উপবাজারে পণ্য বিপণন করা হলে বিপণনকারী লাভজনক উপায়ে ব্যবসায় করতে পারবে না।
৫. পার্থক্যকরণযোগ্যতা (Differentiability): প্রত্যেক বাজার-বিভাগ অন্যান্য বাজার-বিভাগ থেকে ভিন্ন রকমের হতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি বাজার অংশ বিপণন মিশ্রণের উপাদান ও কর্মসূচির প্রতি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকে।
অনলাইনে তাজা মাছের ব্যবসায়
বাংলাদেশের অনেক উদ্যোক্তা অনলাইনে তাজা মাছের অর্ডার গ্রহণ করে পৌঁছে দেন ক্রেতার দোরগোড়ায়। সামুদ্রিক, মিঠাপানির, চাষের মাছের সাথে সাথে বাংলাদেশের বিলুপ্তপ্রায় মাছও ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী সংগ্রহ করে সরবরাহ করা হয়। অনলাইন ব্যবসায় ক্রেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা সবচেয়ে কঠিন। মাছ পচনশীল পণ্য বলে এই ব্যবসার চ্যালেঞ্জও বেশি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় কোনোভাবেই যেন পঁচা মাছ সরবরাহ করা না হয়।
তারপরও কখনো কোনো ক্রেতা মাছ নিয়ে সন্তুষ্ট না হলে আবার মাছ দিয়ে বা টাকা ফিরিয়ে দিয়ে ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা চালানো হয়। এতে করে একই ক্রেতা বারবার মাছ কিনছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাছ হাতে পাওয়ার তা দ্রুতই ক্রেতাদের বাড়িতে পৌছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী আস্ত মাছ বড় কার্টনে, আবার, পরিষ্কার করে বিভিন্ন আকারে টুকরো করা মাছ বরফ দিয়ে প্যাকেট করা হয় এমনভাবে যেন নষ্ট না হয়। বাইক রাইডাররা তৈরি প্যাকেট ও কার্টন ঢাকার বিভিন্ন এলাকাতে পৌঁছে দিচ্ছেন।

সারসংক্ষেপ
বাজার বিভক্তিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাজারকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। বাজারের এসব ছোট ছোট অংশকে বলা হয় বাজার অংশ। চূড়ান্ত পণ্য যারা ভোগ করে তাদেরকে নিয়ে ভোক্তা বাজার গঠিত। সাধারণত ভোক্তা বাজারকে চারটি ভিত্তির আলোকে বিভক্ত করা হয়। যথা: ভৌগোলিক বিভক্তিকরণ, জনমিতিক | বিভক্তিকরণ, মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ ও আচরণমূলক বিভক্তিকরণ। অন্যদিকে ব্যবসায় বাজারে ক্রেতা পুনরায় সেই পণ্য বিক্রয় বা পুনঃপ্রক্রিয়ার জন্য পণ্য ক্রয় করে। ব্যবসায় বাজারও ভোক্তা বাজার বিভক্তিকরণের ভিত্তিসমূহের ওপর ভিত্তি করে বিভক্তিকরণ করা যায়।
তবে ব্যবসায় বাজার বিভক্তিকরণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে; যেমন: ক্রেতা প্রকৃতি, প্রতিষ্ঠানের আয়তন, ক্রয়কার্য পদ্ধতি, ক্রয় অবস্থা ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান। বাজার বিভক্ত করার সময় বিপণনকারীকে কিছু শর্ত পূরণ করে বাজারকে বিভক্তি করা প্রয়োজন হয়। সেই শর্তগুলো হলো উপাদানের পরিমাপযোগ্যতা, প্রবেশযোগ্যতা, কার্যোপযোগিতা, পর্যাপ্ততা ও পার্থক্যকরণযোগ্যতা।

১ thought on “বাজার বিভক্তিকরণ”