ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া

ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “ব্যক্তিক বিক্রয় এবং প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন” ইউনিট ১১ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া

 

ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া

Personal Selling Process

ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ায় ক্রেতাদের সর্বোচ্চ ভ্যালু ও সন্তুষ্টি প্রদানের মাধ্যমে তাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক সৃষ্টি ও বিক্রয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালানো হয়। নতুন ক্রেতা খুঁজে বের করা এবং ধরে রাখাই এ প্রক্রিয়ার প্রধান উদ্দেশ্য। ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপ নিচে তুলে ধরা হলো-

 

বিক্রয় প্রক্রিয়া

 

১) সম্ভাব্য ক্রেতা অনুসন্ধান (Searching Potential Buyers): ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হয় সম্ভাব্য ক্রেতাদের অনুসন্ধান করা এবং তাদের যোগ্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে। বিক্রয়কর্মীর প্রচেষ্টা সফল হয় যদি প্রকৃত ক্রেতারা প্রতিষ্ঠানের ভ্যালু মিশ্রণে সাড়া প্রদান করে। প্রকৃত ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের খুঁজে বের করার কার্যাবলিকে ক্রেতা অনুসন্ধান বলা হয়। প্রকৃত ভোক্তা সম্পর্কিত তথ্য বিভিন্ন উৎস হতে সংগ্রহ করা যায়। যেমন: অন্য ভোক্তাদের উল্লেখ, সরবরহকারী, ডিলার, অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিক্রয়কর্মী, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, তথ্য বা রেফারেন্স, কৌশলগত জরিপ, প্রকাশনাসমূহ, কোম্পানি রেকর্ড ইত্যাদি। সম্ভাব্য ক্রেতাদের তালিকা প্রস্তুত করে বিক্রয়কর্মী উক্ত ক্রেতাদের ক্রয় যোগ্যতা যাচাই করে থাকে, এক্ষেত্রে ক্রেতাদের আর্থিক সংগতি, সমস্যা, প্রয়োজন, ক্রেতার অবস্থান, প্রতিযোগী পণ্যের ধরন ও সেবা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য যাচাই করা হয়ে থাকে ।

২) পূর্ব অভিগমন (Preapproach): সরাসরি বিক্রয় প্রচেষ্টার পূর্বে বিক্রয়কর্মী সম্ভাব্য ক্রেতাদের সমস্যা, চাহিদা এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালায়। এ প্রচেষ্টাকে পূর্ব অভিগমন বা Preapproach বলা হয়। Philip Kotler এবং Gary Aramstrong এর মতে, “Preapproach is the sales step in which salesperson learn as much as possible about a prospective customer before making a call.” অর্থাৎ সম্ভাব্য ক্রেতার সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য প্রকৃত বিক্রয় প্রচেষ্টার পূর্বে জেনে নেওয়ার প্রয়াসকে পূর্ব অভিগমন বলা হয়। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী বিক্রয়কর্মী বিক্রয় প্রয়াসের উদ্দেশ্য পূর্বেই নির্ধারণ করে নিতে সক্ষম হয়। বিক্রয় প্রয়াসের উদ্দেশ্য সম্ভাব্য ক্রেতা যাচাই, তথ্য সংগ্রহ, তাৎক্ষণিক বিক্রয় ইত্যাদির যেকোনোটি হতে পারে। উদ্দেশ্য এবং ক্রেতার সময় অনুযায়ী বিক্রয় কৌশল নির্ধরণ করা পূর্ব অভিগমনের অন্যতম কার্যাবলি।

৩) অভিগমন (Approach): সম্ভাব্য ক্রেতার সাথে প্রকৃত সাক্ষাতের মুহূর্তকে অভিগমন বলা হয়। অনলাইন বা অফলাইনে, ব্যক্তিগতভাবে, ডিজিটাল সম্মেলন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম দ্বারা অভিগমন পরিচালিত হতে পারে। এক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মী প্রাথমিকভাবে অনুকূল সংলাপ দিয়ে শুরু করে এবং পরে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর পর্ব, পণ্য প্রদর্শনী, নমুনা, পণ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে ভোক্তা মনোযোগ এবং আগ্রহ সৃষ্টির চেষ্টা করে থাকে। ক্রেতার সমস্যা, সুবিধাদি, প্রয়োজন ইত্যাদি মনোযোগ সহকারে শোনা এবং ভোক্তা চাহিদা নিরূপণ অভিগমন ধাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া

৪) পণ্য উপস্থাপন এবং প্রদর্শনী ( Product Presentation and Demonstration): ভোক্তা পণ্য বা সেবা ক্রয় করে তাদের সমস্যার সমাধানের উদ্দেশ্য। এককথায় ক্রেতা সমাধান ক্রয় করে, পণ্য নয়। পণ্য উপস্থাপন এবং প্রদর্শনীর পূর্বে বিক্রয়কর্মীকে ভোক্তার সমস্যা অনুধাবন করে পণ্যকে উক্ত সমস্যার সমাধান হিসেবে তুলে ধরতে হবে। এই পদ্ধতিতে বিক্রয়কর্মীকে ভোক্তা সমস্যা অনুধাবন এবং সমস্যা সমাধানে দক্ষ হতে হয়। ক্রেতারা সাধারণত উত্তম শ্রোতা, সততা, নির্ভরযোগ্যতা, পুঙ্খানুপুঙ্খতা, ভ্যালু উপস্থাপনা ইত্যাদি বিক্রয়কর্মীর গুণাগুণকে অধিক মূল্য প্রদান করে। বিক্রয়কর্মী পণ্য উপস্থাপনা এবং প্রদর্শনীকে আকর্ষণীয় করে তোলার নিমিত্তে মাল্টিমিডিয়া, অনলাইন উপস্থাপনা প্রযুক্তি, ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ক্রেতাদের বিস্তারিত পণ্য-জ্ঞান প্রদান সহজতর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

৫) আপত্তি নিষ্পত্তিকরণ (Compliants Management): পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের যৌক্তিক বা মানসিক যেকোনো ধরনের আপত্তির মোকাবিলা বিক্রয়কর্মীকে করতে হতে পারে। এতএব আপত্তি নিষ্পতিকরণ ধাপে বিক্রয়কর্মীকে অনুকূল অভিগমন, লুকায়িত অভিযোগ চিহ্নিতকরণ, ক্রেতা বক্তব্যর মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিতকরণ, আপত্তিকে সুযোগে পরিণতকরণ এবং ক্রয়ের জন্য সমাধানে রূপান্তরিত করাই এ ধাপের প্রধান কার্যাবলি। বিক্রয়কর্মীকে সর্বদাই দক্ষতার সাথে ক্রেতা অভিযোগগুলোকে সমাধান করে ক্রয় সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সাহায্য করা আবশ্যক।

৬) বিক্রয়কার্য সমাধান (Ending Sales Process): ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া এবং বিক্রয়কর্মীর প্রধান প্রচেষ্টা হলো পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে ভোক্তার নিকট থেকে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা। আপত্তি নিষ্পত্তিকরণের পর বিক্রয়কর্মী ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত এবং প্রকৃত বিক্রয়ের ব্যবস্থাপনা করে থাকে। এক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীকে ক্রেতার বিভিন্ন ক্রয় সংকেত অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। যেমন: পণ্য ক্রয় অর্ডার লিখতে চাওয়া, ক্রয় চুক্তি বিস্তারিতভাবে পুনরায় জানানো, নির্দিষ্ট মডেল সম্পর্কে ক্রেতার আপত্তি জানতে চাওয়া ইত্যাদি। এর সাথে ক্রেতার জন্য বিশেষ ছাড়, সৌজন্য পণ্য, ব্যয় হ্রাস সুযোগ ও অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে বিক্রয়কার্য সম্পন্ন করে থাকে।

৭) অনুবর্তন (Follow-up ) : ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জন এবং ভবিষ্যৎ বিক্রয় ধরে রাখার জন্য বিক্রয়কর্মীকে বিক্রয়কার্য সম্পদনের পর প্রয়োজনীয় অনুবর্তন প্রদান করতে হয়। বিক্রয়-পরবর্তী প্রয়োজন, যেমন: পণ্যের কার্যকারিতা, বিশেষ নির্দেশনা, সংযোজনসংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি সম্পর্কিত আলাপন থেকে বিদ্যমান সমস্যা বা ভোক্তা সন্তুষ্টি সম্পর্কে সহজেই তথ্য সংগ্রহ প্রয়োজন। বিক্রয়-পরবর্তী সমস্যার সমাধান ও সঠিক সেবা প্রদানের মধ্যমে বিক্রয়কর্মী ক্রেতা আনুগত্য এবং পুনঃ বিক্রয় নিশ্চিত করতে পারে।

মোটকথা বিক্রয়কর্মীকে দক্ষতার সাথে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ পরিচালনা করতে হবে। প্রতিটি ধাপের সাফল্যই সামগ্রিক বিক্রয় কার্যক্রম ত্বরান্বিত ও ক্রেতা আনুগত্য সৃষ্টির সোপান হিসেবে কাজ করবে।

 

 

সারসংক্ষেপ

নতুন ক্রেতাদের খুঁজে বের করা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতায় পরিণত করাই ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়ার মূল | উদ্দেশ্য। ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়াটি সাতটি ধাপে বিভক্ত। যথা: সম্ভাব্য ক্রেতা অনুসন্ধান ও নির্বাচন, পূর্ব অভিগমন, | অভিগমন, উপস্থাপন ও প্রদর্শন, অভিযোগ নিষ্পত্তিকরণ, বিক্রয়কার্য সম্পাদন ও অনুবর্তন।

১ thought on “ব্যক্তিক বিক্রয় প্রক্রিয়া”

Leave a Comment