বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “বিজ্ঞাপন, বিক্রয় প্রসার এবং জনসংযোগ” ইউনিট ১০ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন

বিজ্ঞাপনী মাধ্যম কাকে বলে?

What is Advertising Media?

বিজ্ঞাপনী মাধ্যম বলতে যে বাহন বা পন্থার দ্বারা বিজ্ঞাপনী বার্তা নির্দিষ্ট ভোক্তাদের বা (Target Audiance) নিকট সরবরাহ করা হয় তাকে বোঝায়। যেমন: টেলিভিশন, ভিডিও, সংবাদপত্র ইত্যাদি একসময় বিপণনের মাধ্যমে পরিকল্পনা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতো না। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমের ধারণা পরিবর্তন, নতুন নতুন যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নয়ন বা গণমাধ্যমের কার্যকারিতা হ্রাস ইত্যাদি বিষয় যোগাযোগের মাধ্যমে নির্বাচন এবং সঠিক পরিকল্পনার অপরিহার্য করে গড়ে তুলেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী এবং ভোক্তার পারস্পরিক সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেও পণ্য ভ্যালু উৎপাদিত হচ্ছে।

অতএব সঠিক মাধ্যম পরিকল্পনা এবং টার্গেট বাজারের জন্য উপযুক্ত মাধ্যমগুলো খুঁজে বের করা বার্তা উন্নয়নের চেয়ে অধিক বিবেচ্য বিষয়। মাধ্যম পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রধান ধাপসমূহ হলো-

 

 

১. মাধ্যমের প্রসারণ, পৌনঃপুনিকতা, প্রভাব এবং ভোক্তা অংশগ্রহণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারণ (Determining Advertising Reach, Frequency, Impact and Engagement):

নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনী মাধ্যম নির্বাচনের পূর্বে বিজ্ঞাপনী উদ্দেশ্যসমূহ অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় বার্তার প্রসারণ, বার্তা প্রকাশে পৌনঃপুনিকতা, বার্তার প্রভাব এবং ভোক্তা নিয়োজিতকরণের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

 

i. প্রসারণ (Reach): নির্দিষ্ট বাজার বা ভোক্তা সমষ্টির মাঝে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার যে শতাংশ ভোক্তার কাছে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা প্রয়োজন তার পরিমাপকে বিজ্ঞাপনের প্রসারণ বলা হয়। যেমন: বিজ্ঞাপন প্রদানকারীর বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়া প্রথম মাসের মধ্যে ৫০ শতাংশ টার্গেটকৃত ভোক্তাদের মাঝে প্রসারণ প্রয়োজন ।

ii. পৌনঃপুনিকতা (Frequency): একজন ভোক্তার নিকট কতবার বিজ্ঞাপনের বার্তা প্রকাশ করা প্রয়োজন তার পরিমাপকে পৌনঃপুনিকতা বলা হয়। যেমন বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য দিনে পাঁচবার বিজ্ঞাপনী বার্তা ভোক্তার নিকট প্রেরণ করা প্রয়োজন।

প্রভাব (Impact): নির্দিষ্ট মাধ্যমের গুণগত মানের পরিমাপকে প্রভাব নির্ধারণ বলা হয়। এক এক বিপণন মাধ্যমের প্রভাব একএক রকম। সাধারণ জনগণের কাছে পৌছানোর জন্য টেলিভিশন বা রেডিও আবার শিক্ষিত জনগণের জন্য দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমের প্রভাব বেশি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেসব পণ্যের প্রদর্শনী বেশি প্রয়োজন সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে টেলিভিশন বা প্রচার মাধ্যমগুলো অধিক কার্যকর।

ভোক্তা নিয়োজিতকরণ (Engagement): বিজ্ঞাপন প্রকাশের সংখ্যার চেয়েও বিজ্ঞাপনটিতে ভোক্তার মনোযোগ এবং অংশগ্রহণ অধিক জরুরি। যেমন: টোল ফ্রি রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্দিষ্ট মাধ্যমে যোগাযোগ করছে কি না। নিয়োজিত ভোক্তা সব সময় ব্র্যান্ড বার্তা অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং অন্যদের নিকট বার্তা প্রকাশে সচেষ্ট থাকে।

 

২. প্রধান মাধ্যমের ধরনসমূহ হতে নির্বাচন (Selecting Major Advertising Media):

বর্তমানকালে বহুল পরিচিত বিজ্ঞাপনী ধরনগুলোর মধ্যে প্রচার মাধ্যম, মুদ্রণ মাধ্যম, ডিজিটাল মাধ্যম, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিজ্ঞাপনী বার্তা প্রচারের ক্ষেত্রে প্রতিটি মাধ্যম ধরনেরই সুবিধা- অসুবিধা পরিলক্ষিত হয়। মাধ্যমের ধরন নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাধ্যমের প্রভাব। বার্তার কার্যকারিতা এবং খরচ বা ব্যয় নির্বাচন।

বিজ্ঞাপনদাতাকে বিজ্ঞাপনী বার্তা কার্যকরভাবে ও দক্ষতার সাথে টার্গেট অডিয়েন্সের নিকট উপস্থাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের মাধ্যমের সমন্বয়ে একটি উপযুক্ত যোগাযোগের মাধ্যমে মিশ্রণ তৈরি করার প্রয়োজন হয়। গতানুগতিক গণমাধ্যমগুলোর কার্যকারিতা হ্রাস এবং নতুন নতুন যোগাযোগের মাধ্যমের আবিষ্কার ও ব্যবহার বিপণনকারীর জন্য বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অধিক জটিল করে তুলেছে। নিচে ছকের মাধ্যমে প্রধান মাধ্যমগুলোর সুবিধা-অসুবিধাসমূহ তুলে ধরা হলো।

 

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম

 

৩. নির্দিষ্ট মাধ্যম বাহন নির্বাচন (Selecting Media Vehicles):

মাধ্যম নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপ হলো বিভিন্ন ধরনের মাধ্যমের মাঝে সর্বোত্তম বার্তা বাহনের ধরন নির্বাচন করা। যেমন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাঝে ফেসবুক, টুইটারকে বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যবহার করা। অথবা গণ মাধ্যম টিভি, রেডিও নির্বাচন করা। নির্দিষ্ট বাহন পছন্দকরণের ক্ষেত্রে অডিয়েন্স (Audiance) প্রতি ব্যয় এবং মাধ্যমের কার্যকর প্রভাবকে অধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এছাড়াও নির্দিষ্ট মাধ্যমের অডিয়েন্স বা ভোক্তাদের গুণগত মান, বিশেষ সিদ্ধান্তসমূহ সূক্ষ্মভাবে বিচার-বিশ্লেষণযোগ্য।

 

৪. মাধ্যমের সময় নির্ধারণ (Selecting Media Time):

সময় তালিকা নির্ধারণ মাধ্যম পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূ সিদ্ধান্ত। সময় তালিকা বলতে একটি বিজ্ঞাপন নির্দিষ্ট সময়সীমার মাঝে কোন সময়ে এবং কতবার প্রচারিত হবে তা নির্ধারণ করাকে বোঝায়। ভোক্তা বা অডিয়েন্সের সর্বোচ্চ উপস্থিতি ও বিজ্ঞাপনে অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণের ওপর ভিত্তি করে মূলত তালিকা নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের (Live streaming) মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে একই সময়ে সম্প্রচারিত হয়।

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন

৫. বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা ও ফলাফল মূল্যায়ন (Evaluating Advertising Effectiveness and Results) :

সবসময় বিজ্ঞাপনী বিনিয়োগের প্রাপ্তির মূল্যায়ন করা এবং প্রয়োজনীয় সমস্যা চিহ্নিত করা অতীব প্রয়োজনীয়। বিজ্ঞাপনের ফলাফল সাধারণ দুইভাবে মূল্যায়িত হয়।

ক. যোগাযোগের প্রভাব (Impact of Communication): এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মাধ্যমে প্রচারিত বিজ্ঞাপন সঠিক বার্তা প্রচার করছে কি না? বিজ্ঞাপনের ফলাফল হিসেবে ভোক্তা-জ্ঞান বৃদ্ধি ও ভোক্তা নিয়োজিতকরণের প্রয়োজনীয় গড় সৃষ্টি হচ্ছে কি না? ইত্যাদি পরিমাপ করা হয়।

খ. বিক্রয় এবং মুনাফার ওপর প্রভাব (Impact of Profit and Sales): এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের প্রাতিষ্ঠানিক বিক্রয় এবং মুনাফার ওপর প্রভাব পরিমাপ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিক্রয় এবং মুনাফা বিজ্ঞাপন বাদে অন্যান্য অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন: ঋতু, মূল্য, প্রতিযোগিতা, পরিবেশ ইত্যাদি। এ কারণে সরাসরি বিক্রয় ও মুনাফার ওপর প্রভাব নির্ধারণ অনেকটা জটিল ও সময়সাপেক্ষ বিষয়।

 

বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন পাঠের সারসংক্ষেপ

যে পরিবহন বা পন্থার মাধ্যম বিজ্ঞাপনী বার্তা নির্দিষ্ট ভোক্তার নিকট সরবরাহ করা হয় তাকে বিজ্ঞাপনী মাধ্যম বলা হয়। বিজ্ঞাপনী মাধ্যম পরিকল্পনায় প্রধান ধাপসমূহ হলো, যথা: মাধ্যমের প্রসারণ, পৌনঃপুনিকতা, প্রভাব এবং ভোক্তা অংশগ্রহণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ। প্রধান মাধ্যমের ধরনসমূহ হতে নির্বাচন নির্দিষ্ট মাধ্যম পরিবহন নির্বাচন, সময় নির্ধারণ ও বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা ও ফলাফল মূল্যায়ন। প্রধান মাধ্যমের ধরনগুলোর মাঝে প্রচার মাধ্যমে, মুদ্রণ মাধ্যম ডিজিটাল মাধ্যম, মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রত্যক্ষ মাধ্যমগুলো সাধারণত ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।

১ thought on “বিজ্ঞাপনের মাধ্যম নির্বাচন”

Leave a Comment