বিপণনের প্রচেষ্টা পরিচালনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “কোম্পানি ও বিপণন কৌশল” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণনের প্রচেষ্টা পরিচালনা
বিপণনের প্রচেষ্টা পরিচালনা করার জন্য অধিকাংশ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সাধারণত পাঁচটি ব্যবস্থাপনার কাজ সম্পন্ন করে তা চিত্র নং ২.৬ এ দেখানো হয়েছে। সাধারণত কর্পোরেট হেড কোয়ার্টার পুরো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনার সময় প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ বিপণন বিভাগসহ অন্যান্য সকল বিভাগ, ব্র্যান্ড, পণ্য- এর জন্য পরিকল্পনা বিভাজন করে দেওয়া হয়।
এর ফলে প্রতিটি বিভাগ নির্দিষ্ট পরিকল্পনার উদ্দেশ্যটি অর্জন করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। বাস্তবায়ন ও সংগঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনাকে কাজে রূপান্তর করা হয়। সর্বশেষে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফলাফল মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

বিপণন বিশ্লেষণ
Marketing Analysis
বিপণণের কাজ শুরু করার প্রথম কাজটি হলো বিপণন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা সময় বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য বাজার চাহিদা, বাজার প্রবণতা, বাজার প্রবৃদ্ধি এর সাথে সাথে বাজার বিভাজনের ভিত্তিসমূহ, মোট বাজারের আয়তন এবং ক্রেতার চাহিদাকে প্রভাবিত করে এমন পরিবেশগত উপাদানগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও বর্ণনা করা হয়। সাধারণত, SWOT বিশ্লেষণ (SWOT Analysis) এর মাধ্যমে বিপণন পরিবেশ বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিষ্ঠানের সার্বিক সামর্থ্য, দুর্বলতা, সুযোগ এবং হুমকিকে সনাক্ত ও মূল্যায়নকে SWOT বিশ্লেষণ বলে যাচিত্র ২.৭ এ দেখানো হয়েছে।
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি হলো SWOT Analysis। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশের বিভিন্ন বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সামর্থ (Strength) ও দুর্বলতা (Weakness) অনুধাবন করে। অন্যদিকে, একই সাথে প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক পরিবেশের উপাদান বিশ্লেষণ করে সুযোগ (Opportunity) ও হুমকি (Threat) নির্ধারণ করে ।
যে সকল অপ্রত্যাশিত বা অস্বাভাবিক অবস্থা ব্যবসায় কর্মকান্ডের উপর বাধা সৃষ্টি করে তাকে হুমকি বলে। অন্যদিকে যে সকল আকর্ষণীয় ক্ষেত্ৰসমূহে প্রতিষ্ঠানের লাভজনকভাবে বিপণন কার্যাবলি সম্পাদন করে তাকে বিপণন সুযোগ বলে। বিপণনকারীকে প্রতিনিয়ত হুমকি ও সুযোগ বিশ্লেষণ করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাম্প্রতিক এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো দ্বারা কিভাবে প্রতিষ্ঠান প্রভাবিত, আক্রান্ত বা উপকৃত হবে তা যেনো পূর্বানুমান করা যায়। বিপণনকারী তাদের চিন্তা- শক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য সকল হুমকি এবং সুযোগ অনুমান করে।
বিপণনকারীকে হুমকির প্রকৃতি অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির মূল্যায়ন করে এবং যে সকল হুমকিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বেশি, সেগুলো মোকাবিলার জন্যে পূর্ব পরিকল্পনা তৈরি করে। অন্যদিকে সম্ভাব্য সুযোগের তুলনামূলক আকর্ষণীয়তা এবং এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের সফলতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে সুযোগগুলো গ্রহণ করে বাজারে টিকে থাকার পূর্বপরিকল্পনা প্রস্তুত করে। প্রতিষ্ঠান তার সামর্থ্য ও দুর্বলতা অনুযায়ী বাহ্যিক পরিবেশের সুযোগ গ্রহণ ও হুমকি মোকাবেলা করে।

বিপণন পরিকল্পনা
Marketing Planning
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে কী করা হবে, কীভাবে করা হবে, কোথায় করা হবে, কে করবে ইত্যাদির একটি অগ্রীম কর্মসূচি প্রণয়নকে বিপণন পরিকল্পনা বলা হয়। এটি একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। কখনো একবছর, অথবা দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিপণন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সুতরাং বিপণন পরিকল্পনা হলো সকল কাজের লিখিত ও সংক্ষিপ্ত একটি রূপ যা নির্দেশ করে বাজার বিশ্লেষণ করে বিপণনকারীর অর্জিত জ্ঞান এবং প্রতিষ্ঠানের বিপণন উদ্দেশ্য অর্জনের কর্মপন্থা। এ পরিকল্পনায় বিপণন প্রোগ্রামের কার্যপদ্ধতির এবং নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনাকালীন সময়ে অর্থ বন্টনের নির্দেশনা রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ- কোনো প্রতিষ্ঠানের বিপণন উদ্দেশ্য যদি ধরা হয় বাৎসরিক ১০০০ ইউনিট পণ্য বিক্রয় করা; তাহলে প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন বিভাগসমূহ এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য একসাথে কাজ করবে। উৎপাদন বিভাগ ১০০০ ইউনিট পণ্য প্রস্তুত করার প্রস্তুতি নিবে, অর্থ বিভাগ পণ্য প্রস্তুত করার জন্য কাঁচামাল ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে খরচ করবে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পণ্য প্রস্তুত ও বিক্রয়ের জন্য কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিবে। এর সাথে সাথে বিপণন প্রোগ্রাম বা কর্মকাণ্ড যেমন: পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, সঠিক স্থানে পণ্য পৌছে দেওয়া এবং বিপণন প্রসারের জন্য কাজ করা।
এসবগুলো কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হলেই বিপণন উদ্দেশ্য অর্থাৎ ১০০০ ইউনিট পণ্য বাৎসরিক বিক্রয়ের লক্ষ্য মাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। প্রতিষ্ঠান তার প্রতিটি ব্যবসায়, পণ্য বা ব্র্যান্ডের জন্য বিপণন পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। ছোট ব্যবসায় সাধারণত ছোটো পরিসরে অথবা কঠোরভাবে কাঠামো অনুসরণ না করে সহজ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিপণন পরিকল্পনা প্রস্তুত করে; অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। বিপণন পরিকল্পনায় যে সকল বিষয় বা উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকে সেগুলো নিম্নে সারণী ২.১ এর মাধ্যমে দেখানো হলো-

বিপণন বাস্তবায়ন (Marketing Implementation)
কৌশল নির্ধারণ করার পর তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়। এ কর্মসূচি অনুযায়ী সফলভাবে কাজ করা সম্ভব হয়, ব্যবসায়ের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি বা স্টেকহোল্ডারের সাথে সুসম্পর্কের মাধ্যমে। স্টেকহোল্ডার (Stakeholder) বলতে ক্রেতা, কর্মী, সরবরাহকারী, বণ্টনকারি ইত্যাদিদের বোঝানো হয় যারা ব্যবসায়ের কাজের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে বা প্রভাবিত হয়।
বিপণন পরিকল্পনায় কী করা হবে ও কেন করা হবে-এর উত্তর দেওয়া হয়; আর বিপণন বাস্তবায়নে কারা করবে, কোথায় করবে, কখন করবে ও কীভাবে করবে এর উত্তর দেওয়া হয়। অনেক বিপণনকারী ‘সঠিকভাবে কাজ করা’ (বাস্তবায়ন) এর প্রতি জোড় দিয়ে থাকে কিন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘সঠিক কাজটি করা’ (কৌশল অবলম্বন করে) সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিপণন বিভাগ সংগঠন (Marketing Department Organization)
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে বিপণন কৌশল বাস্তবায়ন করার জন্য বিপণন সংগঠন করার প্রয়োজন হয়। ছোটো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি বা মালিকই গবেষণা, বিক্রয়, ক্রেতা সেবা, প্রসার, বিজ্ঞাপন ইত্যাদির কাজ করে থাকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান বড় হলে বিপণন বিভাগ আলাদাভাবে গঠন করা হয়, যে বিভাগ বিপণন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য নিয়োজিত থাকে।
বিপণন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য বিপণন বিভাগ কার দ্বারা, কীভাবে, কখন, কত অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে- তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বিপণনকর্ম পরিকল্পনায় রূপান্তর করার জন্য পণ্য, মূল্য, বণ্টন, যোগাযোগ, বিপণন গবেষণা (Marketing Research) ইত্যাদি বিষয়ের কর্মপদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপক ও কর্মীদের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
বিপণন নিয়ন্ত্রণ (Marketing Control)
বিপণন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর প্রতিষ্ঠানকে ফলাফল পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশের প্রবণতা ও পরিবর্তন সনাক্ত করতে হয় এবং সেসব পরিবর্তনের সাথে কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায় সেদিকে বিবেচনা করে কোম্পানির বিপণন কৌশল ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন কার্যক্রম প্রণয়ন করা হয়।
এছাড়াও বিপণণ কৌশলগত পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়া জানার মাধ্যমে কতটা সফলভাবে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে, পরিমাপ করা হয় এবং সে অনুযায়ী পরিবর্তন, উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পূর্বনির্ধারিত আদর্শমান অনুযায়ী বিপণন কার্য সম্পাদিত হচ্ছে কি না তা তদারকি করা এবং আদর্শমান হতে বিচ্যুত হলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাকে বিপণন নিয়ন্ত্রণ বলে। অর্থাৎ, বিপণন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনার ফলাফল পরিমাপ ও মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়,যা বিপণনের উদ্দেশ্য অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

সারসংক্ষেপ:
সাধারণত কর্পোরেট হেড কোয়ার্টার পুরো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনার সময় প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ বিপণন বিভাগসহ অন্যান্য সকল বিভাগ, ব্র্যান্ড, পণ্য- এর জন্য পরিকল্পনা বিভাজন করে দেওয়া হয়। এরফলে প্রতিটি বিভাগ নির্দিষ্ট পরিকল্পনার উদ্দেশ্যটি অর্জন করার জন্য ভিন্ন ভিন্ন কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। বাস্তবায়ন ও সংগঠনের মাধ্যমে পরিকল্পনাকে কাজে রূপান্তর করা হয়। সর্বশেষে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ফলাফল মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বিপণণের কাজ শুরু করার প্রথম কাজটি হলো বিপণন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা সময় বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য বাজার চাহিদা, বাজার প্রবণতা, বাজার প্রবৃদ্ধি এর সাথে সাথে বাজার বিভাজনের ভিত্তিসমূহ, মোট বাজারের আয়তন এবং ক্রেতার চাহিদাকে প্রভাবিত করে এমন পরিবেশগত উপাদানগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও বর্ণনা করা হয়। সাধারণত, SWOT বিশ্লেষণ (SWOT Analysis) এর মাধ্যমে বিপণন পরিবেশ বিশ্লেষণ করা হয়। অভ্যন্তরীণ পরিবেশের বিভিন্ন বিষয়সমূহ পর্যালোচনা করে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সামর্থ (Strength) ও দুর্বলতা (Weakness ) অনুধাবন করে।
অন্যদিকে, একই সাথে প্রতিষ্ঠানের বাহ্যিক পরিবেশের উপাদান বিশ্লেষণ করে সুযোগ (Opportunity) ও হুমকি (Threat) নির্ধারণ করে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে কী করা হবে, কীভাবে করা হবে, কোথায় করা হবে, কে করবে ইত্যাদির একটি অগ্রীম কর্মসূচি প্রণয়নকে বিপণন পরিকল্পনা বলা হয়।
বিপণন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য বিপণন বিভাগ কার দ্বারা, কীভাবে, কখন, কত অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে- তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কৌশল নির্ধারণ করার পর তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব ব্যবসায়ের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বিভিন্ন ব্যক্তি বা স্টেকহোল্ডারের সাথে সুসম্পর্কের মাধ্যমে। বিপণন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনার ফলাফল পরিমাপ ও মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়,যা বিপণনের উদ্দেশ্য অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

১ thought on “বিপণনের প্রচেষ্টা পরিচালনা”