বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ

বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “কোম্পানি ও বিপণন কৌশল” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ

পূর্ববর্তী পাঠে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় কর্পোরেট মিশন, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ব্যবসায় পোর্টফোলিও বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই পাঠে আলোচনা করা হবে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার পরবর্তী পর্যায়ে কিভাবে ক্রেতা ভ্যালুচালিত বিপণন কৌশল ও বিপণ মিশ্রণ নির্ধারণের পরিকল্পনা গ্রহন করা হয়; যা চিত্র ২.৪ এ দেখানো হলো। বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ পরিচালানার কেন্দ্রে অবস্থান করছে ক্রেতা ভ্যালু ও ক্রেতা সম্পর্ক। এরপর বিপণন কৌশল গ্রহণ করা হয়।

বিপণন কৌশল হলো বিপণনের যুক্তিসমূহ যা বিপণনকারী ক্রেতার ভ্যালু সৃষ্টি ও লাভজনক সম্পর্ক তৈরির জন্য গ্রহণ করে। বিপণন কৌশল হলো বাজার বিভাজন, লক্ষ্য বাজার নির্ধারণ, বাজার অবস্থানগ্রহণ ও পৃথকীকরণের সমষ্টি। এরপর বিপণনকারী বিপণন কৌশলের উপর ভিত্তি করে সমন্বিত বিপণন মিশ্রণ (পণ্য, মূল্য, স্থান, প্রসার) তৈরি করে। বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ নিয়ে পরবর্তী ইউনিটগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এরপর আদর্শ বিপণন কৌশল নির্ধারণের জন্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম গ্রহণ করে।

 

ক্রেতা ভ্যালুচালিত বিপণন কৌশল

Customer Value-Driven Marketing Strategy

একই ধরনের পণ্য বা সেবা সকল ক্রেতার কাছে সবসময় গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এইকারণে বিপণনকারী ক্রেতাদের ভিন্নতা অনুযায়ী বাজারকে বিভক্ত করে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সুযোগ রয়েছে এমন বাজারকে নির্দিষ্ট করে পণ্য বা সেবা প্রস্তুত করে সরবরাহ করে । সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি প্রদানের জন্য কোনো পণ্যের সমগ্র বাজারকে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি উপবাজার বা উপবিভাগে বিভক্ত করার নাম বাজার বিভাজন Segmentation)। হলো (Market যেমন: বাংলাদেশের বাজারকে ভৌগোলিক দিক থেকে বিভাগ বা জেলা অনুযায়ী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ইত্যাদি বাজারে ভাগ করা যায়।

বাজার বিভক্ত করার পর বিপণনকারী আকর্ষণীয় ও সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন বাজারকে নির্ধারণ করে, সেই বাজারকে অভীষ্ট বাজার (Target Market) বলে। অভিষ্ট বাজার নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে বাজার লক্ষ্যায়ন (Market Targeting) ও অভিষ্ট বাজারে অবস্থানকারী ক্রেতাদেরকে অভিষ্ট ক্রেতা (Target Customer) বলা হয়। বিপণনকারী বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে অভিষ্ট বাজারের আকর্ষণীয়তা বিচার করে। অভীষ্ট বাজারকে উদ্দেশ্য করে বিপণনকারী তার বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রতিযোগীদের থেকে আলাদাভাবে পরিচিত হবার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে।

প্রতিযোগীদের থেকে শ্রেয় ক্রেতা ভ্যালু তৈরির জন্য বিপণন অপর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়াকে পৃথকীকরণ (Differentiation) বলে। আবার, নিজের পণ্য বা ব্র্যান্ড সম্পর্কে প্রতিযোগীদের তুলনায় ক্রেতার মনে দৃঢ়, স্বচ্ছ ও কাঙ্খিত অবস্থান তৈরির জন্য বিপণনকারীর প্রচেষ্টাকে বাজার অবস্থানগ্রহন (Market Positioning) বলে।

 

 

সমন্বিত বিপণন মিশ্রণ

Integrated Marketing Mix

বিপণন মিশ্রণ শব্দটি কোনো একটি কোম্পানির বিপণন কার্যক্রমের বিভিন্ন উপাদান বা চলকসমূহের উপর গুরুত্ব প্রদান করার জন্য ব্যবহৃত হয়। প্রতিষ্ঠান যেসব বিপণন চলক (Marketing Variables) – পণ্য ( Product), মূল্য (Price), প্রসার (Promotion) ও বণ্টন (Place) ব্যবহার করে সেগুলোকে বিপণন মিশ্রণ নামে অভিহিত করা হয়। এই উপাদানগুলোকে 4P (ফোর পি) বলা হয়।

 

 

পণ্য ও সেবার বিপণন কার্যাবলি বহুমুখী কিন্তু পরস্পর নির্ভরশীল। এসব কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে পণ্যের মান, বৈশিষ্ট্য, বিজ্ঞাপন, বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, গ্রাহক সেবা, গণসংযোগ, তালিকা মূল্য, পরিবহন, মজুদকরণ ইত্যাদি। এইসব কাজগুলো কোনটাই বিচ্ছিন্নভাবে চলতে পারে না। বিপণনের ক্ষেত্রে একটি উপাদানকে বা চলককে অবহেলা করা হলে অন্য উপাদানও দূর্বল হয়ে যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে এইসব উপাদান/চলক প্রতিষ্ঠানের বিপণন মিশ্রণ নামে পরিচিত, যা চিত্র নং ২.৫ এ দেখানো হয়েছে।

১. পণ্য ( Product ) : পণ্য হলো কোন দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান সত্ত্বা যা মানুষের অভাব বা প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। বিপণনকারী বাজার গবেষণার মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তার প্রয়োজন অনুধাবন করে, পণ্য বা সেবা প্রস্তুত করে ক্রেতা বা ভোক্তার ব্যবহার বা ভোগ করার জন্য বাজারে সরবরাহ করে।

২. মূল্য (Price): সঠিক মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে বিপণনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। কোন পণ্য বা সেবা অর্জনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ক্রেতা বা ভোক্তা ও বিপণনকারীর মধ্যে বিনিময় হয় তাকে মূল্য বলে। উৎপাদক, ক্রেতা বা ভোক্তা সকলের কাছে মূল্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কারণ মূল্য হলো বিপণন মিশ্রণের একমাত্র উপাদান যার মাধ্যমে কোম্পানি আয় করতে পারে।

আবার ক্রেতার প্রত্যাশা, সামর্থ্য ও পণ্যের উপযোগের সাথে মূল্যের সামঞ্জস্য থাকলেই ক্রেতা পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হয়। মূল্য নির্ধারণের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো হলো – তালিকা মূল্য (List Price ), বাট্টা (Discount), ছাড় (Allowance), পরিশোধের সময় (Payment period), বাকির শর্ত (Credit terms)।

৩. প্রসার (Promotion) : ক্রেতা বা ভোক্তার সাথে বিপণনকারীর যোগাযোগের মাধ্যম হলো প্রসার। প্রসারের বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে বিপণনকারী ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে পণ্য বা সেবা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে, পণ্য ক্রয়ে প্রণোদনা বা উৎসাহ প্রদান করে এবং পণ্য ক্রয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে, চাহিদা ধরে রাখতে, এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রসারমূলক কার্যক্রমের সাথে বিপণনকারী সংযুক্ত থাকে। এইসব কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞাপন (Advertising), বিক্রয় প্রসার (Sales Promotion), গণসংযোগ (Public Relations), সরাসরি বিজ্ঞাপন (Direct Marketing), এবং ব্যক্তিক বিক্রয় (Personal Selling)।

৪. বণ্টন বা স্থান (Distribution or Place): পণ্য বণ্টনের মাধ্যমে বিপণনকারী সঠিক ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে যথাসময়ে সঠিক মূল্যের বিনিময়ে পণ্য বা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। প্রতিযোগিতার বাজারে বিপণনকারী কত তাড়াতাড়ি পণ্য গ্রাহকের নিকট পৌছাতে পারে তার উপর বিপণনকারীর সাফল্য নির্ভর করে। পণ্যের বণ্টন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো পরিবহণ ও ডেলিভারী (Transportation and Delivery), প্ৰণালী (Channels), আওতাভূক্ত এলাকা (Coverage), সমাবেশ ( Assortments), অবস্থান ( Locations), মজুত মাল (Inventory), বণ্টন সহায়ক সেবা (Logistics)।

 

বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ

 

সারসংক্ষেপ :

কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার ক্রেতা ভ্যালুচালিত বিপণন কৌশল ও বিপণ মিশ্রণ নির্ধারণের পরিকল্পনা গ্রহন করা হয় । বিপণন কৌশল হলো বাজার বিভাজন, লক্ষ্য বাজার নির্ধারণ, বাজার অবস্থানগ্রহণ ও পৃথকীকরণের সমষ্টি। এরপর বিপণনকারী বিপণন কৌশলের উপর ভিত্তি করে সমন্বিত বিপণন মিশ্রণ (পণ্য, মূল্য, স্থান, প্রসার) তৈরি করে। পণ্যের | সমগ্র বাজারকে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি উপবাজার বা উপবিভাগে বিভক্ত করার নাম হলো বাজার বিভাজন।

বাজার বিভক্ত করার পর বিপণনকারী সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এমন বাজারকে নির্ধারণ করে, সেই বাজারকে অভীষ্ট বাজার বলে। অভিষ্ট বাজার নির্ধারণের প্রক্রিয়াকে বাজার লক্ষ্যায়ন ও অভিষ্ট বাজারে অবস্থানকারী ক্রেতাদেরকে অভিষ্ট ক্রেতা বলা হয়। বিপণনকারী বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে অভিষ্ট বাজারের আকর্ষণীয়তা বিচার করে। অভীষ্ট বাজারকে উদ্দেশ্য করে বিপণনকারী তার বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং প্রতিযোগীদের থেকে আলাদাভাবে পরিচিত হবার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে।

প্রতিযোগীদের থেকে শ্রেয় ক্রেতা ভ্যালু তৈরির জন্য বিপণন অপর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করার প্রক্রিয়াকে পৃথকীকরণ বলে। আবার, নিজের পণ্য বা | ব্র্যান্ড সম্পর্কে প্রতিযোগীদের তুলনায় ক্রেতার মনে দৃঢ়, স্বচ্ছ ও কাঙ্খিত অবস্থান তৈরির জন্য বিপণনকারীর প্রচেষ্টাকে বাজার অবস্থানগ্রহন বলে। পণ্য হলো কোন দৃশ্যমান বা অদৃশ্যমান সত্ত্বা যা মানুষের অভাব বা প্রয়োজন পূরণ করতে পারে। কোন পণ্য বা সেবা অর্জনের জন্য যে পরিমাণ অর্থ ক্রেতা বা ভোক্তা ও বিপণনকারীর মধ্যে বিনিময় হয় তাকে মূল্য বলে।

প্রসারের বিভিন্ন উপাদানের মাধ্যমে বিপণনকারী ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে পণ্য বা সেবা সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে, পণ্য ক্রয়ে প্রণোদনা বা উৎসাহ প্রদান করে এবং পণ্য ক্রয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। পণ্য বণ্টনের মাধ্যমে বিপণনকারী | সঠিক ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে যথাসময়ে সঠিক মূল্যের বিনিময়ে পণ্য বা সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে ।

বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ

১ thought on “বিপণন কৌশল ও বিপণন মিশ্রণ”

Leave a Comment