বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ

বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “বিপণন বা বণ্টন প্রণালি, খুচরা ব্যবসায়, পাইকারী ব্যবসায়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ

বিপণন প্রণালির স্তর/ধরনসমূহ

Levels/Types of Marketing Channel

প্রতিষ্ঠান বা বিপণনকারী তাদের পণ্যের সরবরাহ প্রণালি সাজানোর ক্ষেত্রে মূলত ভোক্তার সন্তুষ্টি, চাহিদা এবং পণ্যের ধরনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করে। পণ্যের প্রকৃতি ও ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বিপণনকারী বণ্টন প্রণালির বিভিন্ন স্তর বা ধরন সাজায়। বণ্টন প্রণালির স্তর বলতে একটি ধাপে নিয়োজিত মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সমষ্টিকে বোঝায় যাদের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট সরবরাহ করা হয়। মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সংখ্যা এক্ষেত্রে বণ্টন প্রণালির দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে। বিপণন প্রণালির পর্যায় অনুযায়ী বিপণন প্রণালি মূলত দুই ধরনের-

১. প্রত্যক্ষ বণ্টন প্রণালি (Direct Marketing Channel) এবং

২. পরোক্ষ বণ্টন প্রণালি ( Indirect Marketing Channel)

আবার পণ্যের ধরন অনুযায়ী বিপণন প্রণালি মূলত তিন ধরনের-

(ক) ভোগ্য পণ্যের বণ্টন প্রণালি (Marketing Channel of Consumer Products)

(খ) শিল্প পণ্যের বণ্টন প্রণালি (Marketing Channel of Industrial Products) এবং

(গ) সেবা পণ্যের বণ্টন প্রণালি (Distribution Channel of Services)

 

ক) ভোগ্য পণ্যের বণ্টন প্রণালি

Marketing Channel of Consumer Products

যে সকল পণ্য সরাসরি ভোগ বা ব্যবহার করা হয় তাকে ভোগ্য পণ্য বলা হয়। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে সাধারণত নিম্নোক্ত ধরনের প্রণালিগুলো ব্যবহৃত হতে দেখা যায় যা চিত্র ৮.২ (ক) এ দৃষ্টব্য। যথা:

১. সরাসরি বিক্রয় (Direct Marketing Channel): উৎপাদনকারী এক্ষেত্রে সরাসরি ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয় করে এবং কোনো প্রকার মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ব্যবহৃত হয় না । একে শূন্য পর্যায় স্তরবিশিষ্ট বিপণন প্রণালি (Zero- level Marketing Channel) বলে। কৃষিজ এবং কারখানায় উৎপাদিত ভোগ্য পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষ প্রণালির বহুল প্রচলন দেখা যায়। কৃষক যখন চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট ধান-চাউল বা সবজি তরকারি বিক্রি করে, তখন সে প্রত্যক্ষ প্রণালিই ব্যবহার করে থাকে।

 

বর্তমানে ভোগ্য পণ্যের উৎপাদক ডাকযোগে (Mail order), অনলাইন বিক্রয় (Online Sales), টিভিতে সরাসরি বিক্রয় (TV selling), টেলিমার্কেটিং (Telemarketing), দরজা থেকে দরজায় বিক্রয় (Door to Door selling) বা নিজস্ব খুচরা দোকানের মাধ্যমে পণ্য ভোক্তাদের নিকট সরাসরি বিক্রয় করতে দেখা যায়। এছাড়াও উৎপাদনকারী সরাসরি ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয়ের জন্য প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা উৎপাদক ও ক্রেতার মাঝে পারস্পরিক ক্রিয়াশীল এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। যেমন: রকমারি ডটকম সরাসরি ক্রেতা বা ভোক্তাকে পণ্য পৌঁছে দেয়।

২. পরোক্ষ প্রণালি (Indirect Marketing Channel): এক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প সংখ্যক বা সব ধরনের মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সহযোগিতা গ্রহণ করে থাকে। পরোক্ষ প্রণালি তিন ধরনের হয়ে থাকে।

i. এক স্তর বিশিষ্ট প্রণালি (One Level Channel): যদি উৎপাদনকারী খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে পণ্য ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয় তখন তাকে একক পর্যায় বা স্তরবিশিষ্ট বিপণন প্রণালি বলে। এর মাধ্যমে উৎপাদনকারী অধিক পরিমাণে পণ্য খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করে ।

ii. দুই স্তর বিশিষ্ট প্রণালি (Two Levels Channel): উৎপাদনকারী পণ্যসামগ্রী সরাসরি পাইকারি ব্যবসায়ীর নিকট সরবরাহ করে এবং পরবর্তী সময়ে পাইকার তা খুচরা ব্যবসায়ীর নিকট বিক্রয় করে। একে দুই স্তর বিশিষ্ট বণ্টন প্রণালি বলা হয়। এক্ষেত্রে পাইকার ব্যবসায়ীরা একসাথে অধিক পরিমাণে পণ্য উৎপাদকের কাছ থেকে ক্রয় করে এবং অল্প পরিমাণে বা ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করে খুচরা ব্যবসায়ীর নিকট পণ্য বণ্টন করে। খুচরা ব্যবসায়ীরা তা চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে বিক্রয় করে।

 

খ) শিল্প পণ্যের বণ্টন প্রণালি

Distribution Channel of Industrial Goods

যে সকল পণ্য পুনরায় উৎপাদনের জন্য বা পুনঃ বিক্রয়ের জন্য ক্রয় করা হয়ে তাকে শিল্প পণ্য বলা হয়। সাধারণত শিল্প পণ্যের লেনদেন বৃহৎ আকারের হয়ে থাকে। ক্রেতার সংখ্যাও কম হয়। নিচে চিত্র নং ৮.২ (খ) ব্যবসায় পণ্যের বিভিন্ন ধরনের বণ্টন পদ্ধতি দেখানো হলো-

১. সরাসরি বণ্টন (Direct Distribution): উৎপাদনকারী যখন কোনো মধ্যস্থ কারবারি ছাড়া সরাসরি ব্যবসায়ী পণ্যের ব্যবহারকারীদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে তখন তাকে সরাসরি বণ্টন পদ্ধতি বলে। মেশিনারি, খুচরা যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, বিমান ইত্যাদির ক্ষেত্রে সরাসরি ব্যবহারকারীদের নিকট বিক্রয় করা হয়ে থাকে ।

২. পরিবেশক বা পাইকারের মাধ্যমে বণ্টন (Distribution through Industrial Distributors or wholesellers): এই বণ্টন ব্যবস্থায় উৎপাদক সরাসরি ব্যবহারকারীদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে না। তারা পরিবেশক বা পাইকার অন্বেষণ করে এবং তাদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে। শিল্প পণ্যের ক্রেতারা শিল্প পণ্যের পরিবেশক বা পাইকারের নিকট থেকে পণ্য সংগ্রহ করে।

 

 

৩. উৎপাদনকারীর প্রতিনিধি বা বিক্রয় শাখার মাধ্যমে বণ্টন (Distribution through Manufacturer’s Representative or Sales Branch) : এই ব্যবস্থায় উৎপাদক তার নিজস্ব প্রতিনিধি অথবা বিক্রয় শাখার মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে। সাধারণত উৎপাদক তার একক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য এই পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকে। যে সকল ক্ষেত্রে নিজস্ব বিক্রয় শাখার মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় ব্যয়বহুল বলে মনে হয় সেখানে উৎপাদনকারী নিজস্ব এজেন্টের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে ।

(গ) সেবা পণ্যের বণ্টন প্রণালি

Distribution Channel of Services

বর্তমান যুগে বস্তুগত দৃশ্যমান পণ্যের তুলনায় অবস্তুগত এবং অদৃশ্যমান সেবার ব্যবহার বেড়েই চলছে । সেবা হলো, ি বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত কোনো কার্যাবলি বা সুযোগাদি অথবা সন্তুষ্টি যা অবস্তুগত, অদৃশ্যমান এবং মালিকানা স্বত্বহীন। ভোগ্য পণ্য এবং শিল্প পণ্যের বণ্টনের চেয়ে সেবার বৈশিষ্ট্যগত কারণে বণ্টন প্রণালিতে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। সেবার বণ্টন প্রণালি দুই ধরনের—

১. প্রত্যক্ষ বাজারজাতকরণ (Direct Marketing): উৎপাদনকারী এক্ষেত্রে সরাসরি ভোক্তার নিকট সেবা বিক্রয় করে এবং কোনো প্রকার মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ব্যবহৃত হয় না। সেবার প্রধান বৈশিষ্টসমূহ হলো, সেবা অদৃশ্যমান এবং অবিভাজ্য। তাই এখানে পণ্য বিক্রয়ের জন্য সরাসরি উৎপাদক এবং ক্রেতার উপস্থিতির প্রয়োজন হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রায় সকল প্রকার সেবা সরাসরি বণ্টন প্রণালির মাধ্যমে বিক্রয় করা হয়। যেমন: স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা সেবা, আইনগত পরামর্শ, চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি ।

২. প্রতিনিধির মাধ্যমে বণ্টন (Distribution through Agents): সেবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে বণ্টন করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন সেবার জন্য উৎপাদক তাদের প্রতিনিধি নিয়োগ করে থাকে এবং এদের মাধ্যমে বণ্টন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়। যেমন: বিমা, বিজ্ঞাপন মাধ্যম, বিনোদন সেবা, ট্রাভেল এজেন্সি ইত্যাদি ।

চিত্র ১০.২ (গ) অনুযায়ী সেবা বিপণনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান সরাসরি ভোক্তার বা শিল্প পণ্যের ক্রেতার নিকট পণ্য সরবরাহ করতে পারে। এছাড়া বিক্রয় প্রতিনিধির মাধ্যমে ভোক্তাকে বা শিল্প পণ্যের ক্রেতাকে পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থা করে।

 

বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ

 

সারসংক্ষেপ

প্রতিষ্ঠান বা বিপণনকারী তাদের পণ্যের সরবরাহ প্রণালি সাজানোর ক্ষেত্রে মূলত ভোক্তার সন্তুষ্টি, চাহিদা এবং পণ্যের ধরনের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করে। পণ্যের প্রকৃতি ও ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বিপণনকারী বণ্টন প্রণালির বিভিন্ন স্তর বা ধরন সাজায়। বণ্টন প্রণালির স্তর বলতে একটি ধাপে নিয়োজিত মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সমষ্টিকে বোঝায়, যাদের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট সরবরাহ করা হয়।

মধ্যস্থ ব্যবসায়ীর সংখ্যা এক্ষেত্রে বণ্টন প্রণালির দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে। বিপণন প্রণালির পর্যায় অনুযায়ী বিপণন প্রণালি মূলত দুই ধরনের-১. প্রত্যক্ষ বণ্টন প্রণালি এবং ২. পরোক্ষ বণ্টন প্রণালি। আবার পণ্যের ধরন অনুযায়ী বিপণন প্রণালি মূলত তিন ধরনের-(ক) ভোগ্য পণ্যের বণ্টন প্রণালি (খ) শিল্প পণ্যের বণ্টন প্রণালি) এবং (গ) সেবা পণ্যের বণ্টন প্রণালি। ভোগ্য পণ্য এবং শিল্পপণ্যের বণ্টনের চেয়ে সেবার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের কারণে বণ্টন প্রণালিতে পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। সেবা সাধারণত প্রত্যক্ষ বাজারজাতকরণ ও প্রতিনিধির মাধ্যমে বণ্টন করা হয়।

বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ

১ thought on “বিপণন প্রণালির ধরনসমূহ”

Leave a Comment