বিপণন প্রসার বাজেট নির্ধারণ ও প্রসার মিশ্রণ কৌশলসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “ভোক্তা ভ্যালু যোগাযোগ” ইউনিট ৯ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণন প্রসার বাজেট নির্ধারণ ও প্রসার মিশ্রণ কৌশলসমূহ
সামগ্রিক প্রসার বাজেট নির্ধারণ
Setting the Total Promotion Budget
পূর্ববর্তী অলোচনায় আমরা বিপণন প্রসারের বিভিন্ন হাতিয়ারসমূহ এবং যোগাযোগের পদ্ধতি সম্পর্কে জেনেছি। যেহেতু প্রসারমূলক কর্মকাণ্ড অনেক ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ তাই প্রসারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত বাজেট প্রণয়ন করা আবশ্যক। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো কর্মসূচি পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয় তাকে বাজেট বলা হয়। সঠিক এবং পর্যাপ্ত প্রসার বাজেট প্রণয়ন, বিপণন প্রসারের হাতিয়ারসমূহের মধ্যে কার্যকর বণ্টন ইত্যাদি খুবই জটিল সিদ্ধান্ত। নিচে বিপণন প্রসার বাজেট নির্ধারণের চারটি সাধারণ পদ্ধতি অলোচনা করা হলো।
১. সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতি (Affordable Method): কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিপণন প্রসারের জন্য বাজেট নির্ধারণ করে থাকে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান তার সমার্থ্যের বাইরে ব্যয় নির্ধারণ করে না এবং বিক্রয়ের ওপর প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাবকে বিবেচনা করতে আগ্রহীও নয়। এই পদ্ধতিতে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান মূল মুনাফা হতে একটি অংশ বিপণন প্রসারের বাজেট হিসেবে নিয়োজিত করে এবং প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা সত্ত্বেও অন্যান্য ব্যয়কে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে।
২. বিক্রয় শতাংশ পদ্ধতি (Percentage of Sales Method): বিক্রয়ের শতাংশ পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান তার বর্তমান বিক্রয় অথবা অনুমিত ভবিষ্যৎ বিক্রয়ের ওপর অথবা এককপ্রতি বিক্রয় মূল্যের ওপর একটি নির্দিষ্ট হার ধার্য করে বিপণন প্রসারের বাজেট নির্ধারণ করে। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান সহজেই প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যয়ের সাথে পণ্যের বিক্রয়মূল্য এবং এককপ্রতি মুনাফায় হারের সম্পর্ক নির্ধারণে সক্ষম হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বিক্রয় শতাংশ পদ্ধতিতে প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের প্রভাবকে বিপরীতভাবে বিবেচনা করা হয়। এ পদ্ধতিতে সুনির্দিষ্ট কোনো হার উল্লেখ থাকে না এবং প্রসার বাজেট ফান্ডের সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে।
৩. প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি (Competitive – Parity Method): এই পদ্ধতিতে প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের বাজেট প্রতিযোগীদের বাজেটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ব্যবসায় পরিবেশে নিয়োজিত প্রতিযোগীদের ব্যয়কৃত বাজেট থেকে তাদের প্রসারমূলক কর্মসূচির ধারণা অর্জন করে এবং নিজস্ব পরিসর ও বাজেটের গড় হিসাবে নির্ধারণ করে। অনেক ক্ষেত্রে মনে করা হয় প্রতিযোগীদের ন্যায় ব্যয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়ক হবে। কিন্তু প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বাজেট সঠিকভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে কি না সেটা জানাই মূল প্রতিবন্ধকতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা শুধু ব্যয়ের সাথে সম্পর্কিতও নয়।
৪. উদ্দেশ্য ও কার্যভিত্তিক পদ্ধতি (Objective and Task Method): উদ্দেশ্য ও কার্যভিত্তিক পদ্ধতিকে সবচেয়ে যৌক্তিক এবং কার্যকার পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে প্রথমত নির্দিষ্ট প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়। দ্বিতীয়ত নির্ধারিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যাবলির ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে বিপণন প্রসার বাজেট তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বিপণন প্রসারের ব্যয়ের সাথে এর অনুমিত ফলাফলের সম্পর্ক স্থাপন হয়। উদ্দেশ্য ও কার্যভিত্তিক পদ্ধতি অধিক যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ।
বিপণন প্রসারমূলক ব্যয় নির্ধারণের সাথে সাথে অরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বিপণন প্রসারের হাতিয়ারসমূহের বাজেট বণ্টন। বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার এবং প্রত্যক্ষ বিপণন-এই পাঁচটি হাতিয়ারের মধ্যে কোনটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা কোন উপাদানের জন্য অধিক ব্যয় করা হবে, নাকি সব উপাদানের জন্য সমান বাজেট নির্ধারিত হবে সেটা সঠিকভাবে বণ্টন করতে হবে। যেহেতু বিপণন প্রসার মিশ্রণের প্রতিটি উপাদানের ব্যয় এবং বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন তাই বিপণনকারীর প্রতিটি উপাদানের বৈশিষ্ট্য এবং সফলতা অর্জনে নির্দিষ্ট উপাদানের ভূমিকার ওপর নির্ভর করে সামগ্রিক বিপণন প্রসার বাজেট প্রণয়ন করা আবশ্যক।

বিপণন প্রসার মিশ্রণ কৌশলসমূহ
Promotion Mix Strategies
বিপণন প্রসার বা যোগাযোগ মিশ্রণ বলতে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ, প্রত্যক্ষ বিপণন ইত্যাদি প্রসারমূলক হাতিয়ারের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ভোক্তা ভ্যালু অবহিতকরণ, ভোক্তা সম্পৃক্ততা ও ভোক্তা সুসম্পর্ক গঠন এবং প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিতকরণকে বোঝায়। বিপণন প্রসার মিশ্রণ বা যোগাযোগ মিশ্রণের প্রতিটি উপাদানই ক্রেতা সমাগাম বৃদ্ধি, পণ্য ভ্যালু সৃষ্টি এবং ভোক্তা সুসম্পর্ক অর্জনে বিপণনকারীকে সহোযোগিতা করে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নতুন যোগাযোগ মাধ্যম এবং বিশ্বায়নের কারণে বর্তমানের ভোক্তারা অনেক বেশি সতেচন এবং চাহিদাসম্পন্ন।
বর্তমান যুগে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং নতুন নতুন প্রতিযোগীদের আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিপণনকারীকে বিপণন প্রসার সংক্রান্ত সমস্ত হাতিয়ারকে একত্র করে সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। বিপণন প্রসার মিশ্রণে মূলত দুটি মৌলিক কৌশল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথা:
১. ধাক্কা কৌশল (Push Strategy): বণ্টন প্রণালির সদস্যদের মাধ্যমে ভোক্তা চাহিদা সৃষ্টি করার প্রয়াসকে ধাক্কা কৌশল বলা হয়। এক্ষেত্রে বিপণনকারী বিভিন্ন প্রসারমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বণ্টন প্রণালির সদস্যদের প্রতিষ্ঠানের পণ্য ভোক্তাদের নিকট প্রসার এবং বিক্রয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করে থাকে। এক্ষেত্রে সরাসরি বিপণনকারী এবং ভোক্তার মাঝে কোনো যোগাযোগ স্থাপিত হয় না এবং বণ্টন প্রণালির সদস্যরাই যোগসূত্র স্থাপনকারী হিসেবে কাজ করে থাকে। এ প্রসঙ্গে Philip Kotler এবং Gary Aramstrong বলেন, “Push strategy is a promotion strategy that calls for using the salesforce and trade promotion to push that product through the channels. The producer promotes the product to channel members who inturn promote it to the final consumers.”
অর্থাৎ ধাক্কা কৌশল হলো একটি প্রসার কৌশল যেখানে বিক্রয়কর্মী বাহিনী ও ট্রেড প্রমোশন ব্যবহার করে পণ্যকে বণ্টন প্রণালির মধ্যে প্রেরণ করা হয়। উৎপাদক বণ্টন প্রণালির সদস্যদের জন্য বিপণন প্রসার ব্যবহার করে পর্যায়ক্রমে বণ্টন প্রণালির সদস্যরা চূড়ান্ত ভোক্তার জন্য বিপণন প্রসার পরিচালনা করে থাকে। যেমন: বিভিন্ন লুব্রিকেন্টস বা ইঞ্জিন অয়েল প্রস্তুতকারক তাদের বণ্টন প্রণালির সদস্যদের মাধ্যমে পণ্যের প্রসারমূলক কর্মসূচি পালন করে থাকে ।
২. টানা কৌশল (Pull Strategy): সরাসরি চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিকট বিপণন প্রসারের মাধ্যমে বিক্রয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে টানা কৌশল বলা হয়। এক্ষেত্রে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে বণ্টন প্রণালির সদস্যরাও নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবা বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। ভোক্তা চাহিদা বণ্টন প্রণালির মাঝে পণ্যের চাহিদাকে টেনে আনার কাজ করে। Philip Kotler এবং Gary Aramstrong বলেন, “Pull strategy is the promotion strategy that calls for spending a lot on cosumer advertising and promotion to induce final cosumer to buy the product, creating a demand vacuum the pulls the product through the channel”

(অর্থাৎ টানা কৌশল হলো এমন একটি বিপণন প্রসার কৌশল যাতে বিজ্ঞাপন ও ভোক্তা বিপণন প্রসার খাতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে। এতে চাহিদা ভিত্তি তৈরি হয়, যা বণ্টন প্রণালির মাঝে পণ্য টেনে আনে। যেমন: Unilever তাদের সকল ভোগ্য পণ্যের জন্য বিজ্ঞাপন এবং ভোক্তা বিপণন প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিচে চিত্র ১০.৪ এর মাধ্যমে ধাক্কা এবং টানা কৌশল তুলে ধরা হলো: বিপণনকারী কোনো কৌশলটি বিপণন প্রসার মিশ্রণ ডিজাইনের নকশায় ব্যবহার করবে তা মূলত পণ্যের ধরন, ব্যবসায় বাজার, সামগ্রিক পরিবেশ, মুনাফা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। সাধারণত শিল্প ও ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে ধাক্কা কৌশল অধিক কার্যকর। আর ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে টানা কৌশল ব্যয় সাশ্রয়ী এবং অধিক ভোক্তা চাহিদা সৃষ্টিতে সক্ষম ।
বিপণন প্রসার মিশ্রণের সমন্বয় সাধন
Integrating the Promotion Mix
বিপণন প্রসার বাজেট এবং মিশ্রণ কৌশল নির্ধারণের পরবর্তী ধাপে বিপণনকারীকে সামগ্রিক বিপণন উপাদানসমূহের মাঝে সমন্বয় সাধন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সাথে মিল রেখে বিপণন প্রসারসংক্রান্ত উদ্দেশ্য নির্ধারিত হয়ে থকে। এক্ষেত্রে সঠিক ফলাফল অর্জন এবং উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রসার হতিয়ারসমূহকে সমন্বিতভাবে নিয়োজিত করতে হবে। সমন্বিত বিপণন প্রসার কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো অধিক ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জন এবং ভোক্তা বিভ্রান্তি দূরীকরণ।
সমন্বিত প্রসার মিশ্রণে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রত্যক্ষ বিপণন—এই পাঁচ উপাদানের সবগুলো ভোক্তার নিকট একই বার্তা প্রেরণ করে ভোক্তা বিভ্রান্তি দূর করে এবং ভোক্তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা করে। অতঃপর সমন্বিত বিপণন প্রসার মিশ্রণ উন্নয়ন ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি কার্যক্রম যোগাযোগ পরিকল্পনার সাথে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা অপরিহার্য।

সারসংক্ষেপ
যেহেতু প্রসারমূলক কর্মকাণ্ড অনেক ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ তাই প্রসারমূলক কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত বাজেট প্রণয়ন করা আবশ্যক। একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো কর্মসূচি পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয় তাকে বাজেট বলা হয় । বিপণন প্রসার বাজেট নির্ধারণের চারটি সাধারণ পদ্ধতি হলো-১. সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতি, ২. বিক্রয় শতাংশ পদ্ধতি, ৩. প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি এবং ৪. উদ্দেশ্য ও কার্যভিত্তিক পদ্ধতি। বিপণন প্রসারমূলক ব্যয় নির্ধারণের সাথে সাথে অরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিপণন প্রসারের হাতিয়ারসমূহের বাজেট বণ্টন।
বর্তমান যুগে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রতিযোগীদের আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিপণনকারীকে বিপণন প্রসার সংক্রান্ত সমস্ত হাতিয়ারকে একত্র করে সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। বিপণন প্রসার মিশ্রণে মূলত দুটি মৌলিক কৌশল ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যথাঃ ধাক্কা কৌশল ( Push Strategy) এবং টানা কৌশল (Pull Strategy)। বিপণন প্রসার বাজেট এবং মিশ্রণ কৌশল নির্ধারণের পরবর্তী ধাপে বিপণনকারীকে সামগ্রিক বিপণন উপাদানসমূহের মাঝে সমন্বয় সাধন করতে হবে।

১ thought on “বিপণন প্রসার বাজেট নির্ধারণ ও প্রসার মিশ্রণ কৌশলসমূহ”