ব্যক্তিক বিক্রয় : বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “ব্যক্তিক বিক্ৰয়” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।
ব্যক্তিক বিক্রয় : বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব

বিক্রয় কার্যক্রম পৃথিবীর একটি অন্যতম প্রাচীন কার্যক্রম। যারা বিক্রয় কাজে নিয়োজিত থাকে তাদেরকে বিক্রেতা বা বিক্রয়কর্মী বলা হয়। আবার যে সকল মানুষ বিক্রয় কার্যক্রমের সাথে জড়িত তারা সমাজে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন: বিক্রয়কর্মী, বিক্রয় প্রতিনিধি, বিক্রয় নির্বাহী, বিক্রয় কনসালটেন্ট, বিক্রয় প্রকৌশলী, প্রতিনিধি, জেলা ব্যবস্থাপক, শাখা ম্যানেজার, বিপণন প্রতিনিধি ইত্যাদি। ব্যক্তিক বিক্রয়ের মাধ্যমে ক্রেতা এবং বিক্রেতা একে অন্যের অত্যন্ত কাছাকাছি আসে। তাই তারা একে অন্যকে বুঝতে পারে এবং সহজেই একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করতে পারে। বিক্রয়কর্মী যেমন পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে তেমনি ক্রেতাদের একটা আস্থার জায়গা হলো বিক্রয়কর্মী।
বিজ্ঞাপন এবং অন্যান্য প্রসার কৌশলসমূহ হলো এক পাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কিন্তু ব্যক্তিক বিক্রয় হলো দ্বি-পাক্ষিক ও ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবস্থা। এ জাতীয় যোগাযোগ বিভিন্ন ভাবে হতে পারে যেমন টেলিফোনের মাধ্যমে, মুখোমুখি, ভিডিও কনফারেন্স ইত্যাদি। এখানে বিক্রয়কর্মীগণ ক্রেতাদের সমস্যাগুলো সঠিক ভাবে চিহ্নিত করতে পারে এবং সেভাবে বিক্রয় কৌশল নির্ধারণ করতে পারে।
বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় কার্যক্রমের প্রাণ বলা হয়। বিক্রয়কর্মীরা একটি কোম্পানি এবং তার ক্রেতার মধ্যকার সম্পর্ক সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধি, ক্রেতাদের সাথে দীর্ঘ মেয়াদী সম্পর্ক সৃষ্টি এবং স্থায়ী ক্রেতা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিক্রয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিষ্ঠানের উচিত যোগ্যতা সম্পন্ন দক্ষ বিক্রয়কর্মী নির্বাচন করে তাদের মাধ্যমে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা ।

ব্যক্তিক বিক্রয় (Personal Selling):
বিপণন প্রসার মিশ্রণের যতগুলো হাতিয়ার রয়েছে তার মধ্যে ব্যক্তিক -বিক্রয় একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। যেকোন ধরনের ব্যবসায় গ্রাহকদের সামনে পণ্য উপস্থাপনা থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রয়ের কাজে যে সকল ব্যক্তি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত থাকে তাদেরকে বিক্রয়কর্মী বলা হয়। একজন বিক্রয়কর্মীকে যেকোন ব্যবসায়ের প্রাণকেন্দ্র বলা হয়। একজন বিক্রয়কর্মী যত ভাল ভাবে পণ্য উপস্থাপন করতে পারবে পণ্য বিক্রয়ের পরিমাণ তত বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে সাথে ব্যবসায়ের লাভের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। ব্যবসায়ের উন্নতির জন্যই যোগ্য বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দেয়া উচিত । সাধারণত বিক্রয়কর্মী কর্তৃক সরাসরি পণ্য বা সেবা বিক্রয়কে ব্যক্তিক -বিক্রয় বলে। ব্যক্তিগতভাবে বিক্রয়ের প্রচেষ্টাই ব্যক্তিক বিক্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ব্যক্তিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সরাসরি ও মুখোমুখি যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিক্রেতা সরাসরি ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী করে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করে । নিম্নে ব্যক্তিক বিক্রয়ের কিছু সংজ্ঞা প্রদান করা হলো যেখানে বিভিন্ন লেখকগণ বিভিন্নভাবে ব্যক্তিক -বিক্রয়কে বর্ণনা করেছেন।
Converse, Huegy 4 Mitchel 4, “By its very nature, personal selling is a highly personal, individualized or hard labour operation; it is not a mechanical mass operation.” (প্রকৃিতিগতভাবে ব্যক্তিক বিক্রয় সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত, পৃথকীকৃত অথবা কঠিন পরিশ্রমের কাজ যা যান্ত্রিক গণকার্যক্রম নয়।)
অধ্যাপক Philip Kotler এর মতে, “Personal selling is the personal presentation by the firm’s sales force for the purpose of making sales and building customer relationship.” (ব্যক্তিক -বিক্রয় হলো এক ধরণের ব্যক্তিক উপস্থাপনা যা ফার্মের বিক্রয়কর্মীদের দ্বারা বিক্রয় করা এবং ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করার উপায়।)
Evans Berman 4, “Personal selling is an oral presentation in a conversation with one or more prospective buyers for the purpose of making sales.” (ব্যক্তিক- বিক্রয় হলো, এক বা একাধিক সম্ভাব্য ক্রেতার নিকট বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে কথপোকথনের মাধ্যমে এক ধরনের মৌখিক উপস্থাপন।)
E. J. McCarthy, “Personal selling involves direct spoken communication between seller and potential customers.” (ব্যক্তিক -বিক্রয় হলো সরাসরি বিক্রেতা এবং ক্রেতার মধ্যে মৌখিক যোগাযোগ।)
উপরের সংজ্ঞাসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কেবল মাত্র ব্যক্তিগতভাবে বিক্রয় প্রচেষ্টাই ব্যক্তিক বিক্রয় নয়, অধিকিন্তু বিপণন প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে এর তাৎপর্য আরো গভীর।
সুতরাং যখন ক্রেতা-বিক্রেতা পরস্পর মুখোমুখি হয়ে ব্যক্তিগতভাবে কথোপকথনের মাধ্যমে পণ্য বা সেবার বিনিময় ঘটায় এবং ক্রেতাকে প্ররোচিত করে ক্রেতার চাহিদা সৃষ্টি করে সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করার চেষ্টা করে তখন তাকে ব্যক্তিক বিক্রয় বলে। ফলে ব্যক্তিক- বিক্রয় হলো যান্ত্রিক গণকার্যক্রম বহির্ভূত কাজ, যা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রয়কর্মী ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি ক্রেতাদের নিকট বিক্রয় আবেদন করে। অনেক লেখক ব্যক্তিক বিক্রয়কে কেবলমাত্র পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছেন। আসলে ব্যক্তিক- বিক্রয় পণ্য বিক্রয়ের আগে থেকেই শুরু হয় এবং পণ্য বিক্রয়ের পর ক্রেতা সন্তুষ্টি ও বিক্রয় সেবা পর্যন্ত এর কার্যক্রম অব্যহত থাকে।
ব্যক্তিক- বিক্রয়ের ধারণাটি পরিস্কার ভাবে বর্ণনার জন্য ব্যক্তিক বিক্রয়ের ৫পি (5p’s) এর আলোচনা করা প্রয়োজন। যে পাঁচটি স্তরের মাধ্যমে ব্যক্তিক -বিক্রয় পরিচালিত হয় তাদের বলা হয় ব্যক্তিক -বিক্রয়ের ৫পি (5p’s) যা নিম্নে আলোচনা করা হলো:
ক) প্রদানকারী স্তর (Provider stage):
এখানে বিক্রয়কর্মী পণ্য বিক্রয় করার জন্য ক্রেতার সম্মুখে পণ্য উপস্থাপন করে। বিক্রয়কর্মী বিভিন্ন ধরণের বা ব্র্যান্ডের পণ্য উপস্থাপন করে থাকে ।
খ) প্ররোচিতকারী স্তর (Persuador stage):
পণ্য উপস্থাপনের পর বিক্রয়কর্মী ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে। এখানে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিক্রয়কর্মী তার নিজস্ব কলা কৌশল ব্যবহার করে।
গ) প্রসপেক্টর স্তর (Prospector stage):
এই স্তরে বিক্রয়কর্মী সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ করে। যারা পণ্য ক্রয়ের জন্য দোকানে আসে তারা সবাই প্রকৃত ক্রেতা হয় না। বিক্রয়কর্মী সম্ভাব্য ক্রেতার জন্য সময় এবং শ্রম প্রদান করে থাকে ।
ঘ) প্রকৃত সমস্যা সমাধান (Problem solving):
ক্রেতা অনেক সময় অহেতুক কিছু সমস্যা তৈরি করে। বিক্রয়কর্মী এগুলো সহসা এড়িয়ে যায়। তবে ক্রেতা যদি যথার্থই কোন সমস্যার মধ্যে পড়ে তবে এই স্তরে বিক্রয়কর্মী তার সুষ্ঠু সমাধান দিয়ে থাকে ।
ঙ) প্রক্রিয়া স্তর (Process stage):
এই স্তরে ক্রেতা এবং বিক্রেতা তাদের পণ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে একমত প্রকাশ করলে চুড়ান্তভাবে পণ্য ক্রয় বিক্রয় প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়ে থাকে ।
পরিশেষে বলা যায় ব্যক্তিক বিক্রয় বলতে কেবল সরাসরি বিক্রয় সম্পাদনকে বুঝায় না বরং বিক্রয় কার্যক্রমের সাথে জড়িত সংশ্লিষ্ট সকল কার্যক্রমকে ব্যক্তিক- বিক্রয় বলা হয়। বর্তমানে একজন বিক্রয়কর্মীকে অনেকটা মেশিনের মত কাজ করতে হয়। ক্রয় বিক্রয় কার্যক্রমের বাইরেও বিক্রয়কর্মী অনেক কাজ সম্পাদন করতে হয় যা ব্যক্তিক- বিক্রয়ের অন্তর্ভূক্ত। বিশেষ করে প্রত্যাশিত ক্রেতা অনুসন্ধান, প্রত্যাশিত ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধকরণ এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে প্রত্যাশিত ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করার কার্যক্রমকেও ব্যক্তিক বিক্রয় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে ।

ব্যক্তিক বিক্রয়ের বৈশিষ্ট্য (Features of Personal Selling):
বিপণন কার্যাবলীর প্রধান উদ্দেশ্য পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা। ব্যক্তিক- বিক্রয় কৌশল হলো সকল বিক্রয় প্রসার কৌশলের মধ্যে অন্যতম, যার মাধ্যমে বিপণনের উদ্দেশ্য অনেকাংশে সফলতা লাভ করে। যদিও বলা হয়ে থাকে ব্যক্তিগতভাবে বিক্রয়ের প্রচেষ্টাই ব্যক্তিক বিক্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তথাপি বিপণন প্রমোশনের অন্যান্য পন্থার ন্যায় তথ্য সরবরাহ করা, পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং ক্রেতাদের পণ্য সম্বন্ধে পুনঃপুনঃ স্মরণ করিয়ে দেয়াও ব্যক্তিক বিক্রয় কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত । ব্যক্তিক বিক্রয়ের সার্বিক আলোচনা থেকে ব্যক্তিক- বিক্রয়ের নিম্নেক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষ্য করা যায়।
১. ব্যক্তিগত উপস্থাপনা (Personal presentation) :
ব্যক্তিক বিক্রয় হচ্ছে পণ্য বা সেবার ব্যক্তিগত উপস্থাপনা। এখানে অন্য কোন মাধ্যম ব্যবহার করে পণ্য বিক্রয় প্রচেষ্টা চালানো হয় না। সরাসরি ক্রেতা এবং বিক্রেতা বিক্রয় কাজে জড়িত থাকে এবং বিক্রেতা সরাসরি পণ্য ও সেবার মৌখিক উপস্থাপনা করে থাকে ।
২. প্ররোচনামূলক (Persuasive) :
সম্ভাব্য ক্রেতাকে বিভিন্নভাবে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা ব্যক্তিক -বিক্রয়ের অন্যতম কাজ। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ক্রেতাদের সঠিকভাবে প্ররোচিত করতে না পারলে পণ্য বিক্রয় সম্ভব নয়। ব্যক্তিক বিক্রয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের মনে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের চেষ্টা করা হয়।
৩. সম্পর্কের উন্নয়ন (Development of relationship):
ব্যক্তিক- বিক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এটি ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন করে থাকে। ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে ব্যক্তিগত আলোচনা ও পর্যালোচনা, কথাবার্তা, ভাব প্রকাশ ইত্যাদির মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সুন্দর ব্যক্তিগত সম্পর্ক সৃষ্টি হয় যা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
৪. মৌখিক উপস্থাপনা (Oral conversation):
ব্যক্তিক বিক্রয় সম্পূর্ণ একটি মৌখিক উপস্থাপনা। বিক্রয়কর্মী এবং ক্রেতা সরাসরি মৌখিক কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের বিক্রয় কার্য সমাধা করে থাকে। বর্তমানে বিক্রয়কর্মীগণ বিশেষ করে শিল্প পণ্যের বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিডিও কলিং এর মাধ্যমে মৌখিক উপস্থাপনা করছে। মৌখিক উপস্থাপনার জন্য ব্যক্তিক- বিক্রয়কে পণ্য প্রসারের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
৫. প্রশ্নের দ্রুত সমাধান (Quick solution of queries) :
ব্যক্তিক বিক্রয়ের মাধ্যমে ক্রেতাদের যেকোন প্রশ্নের সহজ সমাধান দেয়া যায়। একজন ক্রেতা বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষ করে পণ্য সংক্রান্ত তথ্যাবলী নিয়ে কৌতূহল থাকে বেশি। এসকল প্রশ্নের সহজ সমাধান হয়ে থাকে ব্যক্তিক- বিক্রয়ের মাধ্যমে। বিক্রেতা ক্রেতাকে তার সকল প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারে। অন্য কোন প্রসার মাধ্যমে এ ধরনের সুযোগ থাকে না।
৬. অতিরিক্ত তথ্যাবলী ( Additional Information):
ক্রেতাগণ কেবল পণ্য বা সেবার তথ্য ছাড়াও আরো অনেক তথ্যাবলী সংগ্রহ করতে চায়। এই ক্ষেত্রে ক্রেতাদের পক্ষে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভবপর হয় না। সেই ক্ষেত্রে একজন বিক্রয়কর্মীই পারে ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য সরবরাহ করতে। সেই কারণে বিক্রয়কর্মীকে প্রতিষ্ঠান ও পণ্য সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হয়।
৭. অর্থ প্রদত্ত মাধ্যম (Paid form media) :
ব্যক্তিক বিক্রয় হলো একটি অর্থ প্রদত্ত মাধ্যম। ব্যক্তিক -বিক্রয়ের জন্য উৎপাদনকারীকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। প্রমোশনের যেকোন মাধ্যম থেকে ব্যক্তিক- বিক্রয়ের অর্থ ব্যয় হয় বেশি। বিশেষ করে ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মীর জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়।
৮. নমনীয়তা (Flexibility):
ব্যক্তিক বিক্রয়ের নমনীয়তা খুব বেশি। ব্যক্তিক- বিক্রয় কৌশলসমূহ পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যেকোন সময় সহজেই পরিবর্তন করা যায়। একজন ক্রেতা যদি নির্দিষ্ট কোন বিক্রয় আবেদনে সন্তুষ্ট না হয় তবে সাথে সাথে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আবার ভিন্ন ভিন্ন গ্রাহকের জন্য যেকোন সময় ভিন্ন ভিন্ন বিক্রয় কৌশল গ্রহণ করা যায়।
৯. দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ (Two way communication):
ব্যক্তিক বিক্রয় হলো একটি দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। এখানে ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুইটি পক্ষ বিদ্যমান থাকে। বিক্রেতা যে বিক্রয় তথ্য ক্রেতাকে প্রদান করে তা ক্রেতা গ্রহণ করে এবং সাথে সাথে ক্রেতা তার অনুভূতি ব্যক্ত করে। ফলে ব্যক্তিক- বিক্রয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর মাধ্যমে সাথে সাথে উভয় পক্ষের মতামত পাওয়া যায়।
১০. একটি প্রক্রিয়া (A process) :
ব্যক্তিক বিক্রয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো যে এটি একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণের মাধ্যমে, তার পরে প্রাথমিক আবেদন করা হয়, পণ্য উপস্থাপনা করা হয়, ক্রেতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয় এবং বিক্রয় কার্যক্রম শেষ করা হয় ও ক্রেতাকে গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়। ফলে ব্যক্তিক- বিক্রয় আসলে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।
ফলে দেখা যাচ্ছে যে বিপণন প্রসারের অন্যান্য কার্যক্রম থেকে ব্যক্তিক বিক্রয় অনেকটা আলাদা। ব্যক্তিক- বিক্রয়ের যোগাযোগ পদ্ধতিটির একটি বিশেষ ধরণ রয়েছে। এই কার্যক্রম ক্রেতাদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সৃষ্টি করে। ব্যক্তিক যোগাযোগের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার কারণে এই মধ্যমটি বিপণন মাধ্যমের অন্যান্য হাতিয়ারগুলোর চাইতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

ব্যক্তিক বিক্রয় : বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্বের সারসংক্ষেপ:
বিক্রয়কর্মী কর্তৃক সরাসরি পণ্য বা সেবা বিক্রয়কে ব্যক্তিক বিক্রয় বলে। ব্যক্তিগতভাবে বিক্রয়ের প্রচেস্টাই ব্যক্তিক বিক্রয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যক্তিক বিক্রয় হলো সরাসরি ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে মৌখিক যোগাযোগ। যে পাঁচটি স্তরের মাধ্যমে ব্যক্তিক বিক্রয় পরিচালিত হয় তাদের বলা হয় ব্যক্তিক বিক্রয়ের ৫পি (৫চং)। এই স্তরগুলো হলো প্রদানকারী স্তর, প্ররোচিতকরণ স্তর, প্রসপেক্টর স্তর, প্রকৃত সমস্যার সমাধান ও প্রক্রিয়া স্তর। ব্যক্তিক বিক্রয় কার্যক্রমের সার্বিক আলোচনা থেকে ব্যক্তিক বিক্রয়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
যেমন: ব্যক্তিক বিক্রয় একটি ব্যক্তিগত উপস্থাপনা, এটি একটি প্ররোচনামূলক পদ্ধতি, একটি মৌখিক উপস্থাপনা, একটি দ্বি-পাক্ষিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, একটি নমনীয় কার্যক্রম, সর্বোপরি এটি একটি প্রক্রিয়া ইত্যাদি। একজন বিক্রয়কর্মী কেবল মাত্র পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং তাকে পণ্য বিক্রয়ের আগে ও পরে কিছু কার্যক্রমের সাতে জড়িত থাকতে হয়। সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ থেকে শুরু করে ভোক্তাদের বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল প্রকার কার্যক্রমের সাথে বিক্রয়কর্মীগণ জড়িত থাকে। বিক্রয়কর্মীগণের মাধ্যমে ব্যবসায়ে প্রধান ৩টি গ্রুপ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে | উপকৃত হচ্ছে। প্রথমত, ক্রেতাকেন্দ্রিক বিক্রয় কার্যক্রমের প্রধান হাতিয়ার হলো ব্যক্তিক বিক্রয়।
ক্রেতাদের প্রয়োজন সনাক্তকরণ, ক্রেতাদের নির্দেশনা প্রদান, ক্রেতা সন্তুষ্টি বিধান, ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি, ক্রোদের ভোগ বৈচিত্র্য | বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিক্রয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দ্বিতীয়ত, বিক্রয়কর্মীগণ বিভিন্ন ভাবে ব্যবসায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেমন- বাজারের এবং ক্রেতাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, খরচ নিয়ন্ত্রণ করা, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করা, অর্থনীতিতে চাহিদা সৃষ্টি করা, বিক্রয় কৌশল নির্ধারণ করা, বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফা অর্জন, বাজার সম্প্রসারণ করা, নতুন পণ্য প্রবর্তনে ভূমিকা রাখা, প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করা | ইত্যাদি। তৃতীয়ত ব্যক্তিক বিক্রয় সামাজিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
যেমন- মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, কর্ম জীবনে উন্নতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রবৃদ্ধি অর্জন ইত্যাদি।
