ভোক্তার ক্রয় আচরণ ও প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “প্রকল্প নির্বাচন” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।

ভোক্তার ক্রয় আচরণ ও প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান
যে সকল ক্রেতা তাদের ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ক্রয় করে তাদের ভোক্তা বলা হয়। পণ্য সামগ্রী ক্রয় কালে ভোক্তার মধ্যে আচরণের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাই ভোক্তার আচরণ। যখন বাজারের আয়তন ছোট ছিল তখন ভোক্তা এবং বিপণনকারীর মধ্যে খুব বেশি ব্যবধান ছিল না। সে সময় বিক্রয়কর্মীগণ তাদের অভীজ্ঞতার মাধ্যমে ভোক্তার আচরণ সম্পর্কে জানাতে পারতো। বর্তমানে বাজারের পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপণনকারীগণ সরাসরি ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ হারিয়েছে। ফলে বিপণনকারীগণ বাজার গবেষণার মাধ্যমে ভোক্তদের আচরণ জানার চেষ্টা করছে। ভোক্তা আচরণের মৌলিক বিষয়গুলো হলো কে কিনে, কিভাবে কিনে, কখন কিনে, কোথায় কিনে, কেন কিনে ইত্যাদি।
বর্তমান বিপণন কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত ভোক্তার সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে। ভোক্তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপণন প্রোগ্রামসমূহ যেমন পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রসার সংক্রান্ত যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্বে ভোক্তাদের বিশ্লেষণ করতে হয়। কি পণ্য উৎপাদন করা হবে বা পণ্যের মূল্য কত হবে তা নির্ধারণের পূর্বে ভোক্তার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
ভোক্তার ভোগ প্রবণতা তথা ভোক্তা আচরণের ভিত্তিতে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠে। ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবেশগত উপাদান ভোক্তার আচরণ গঠনে প্রভাব সৃষ্টি করে। কোন পণ্য পরিবেশবান্ধব না হলে ভোক্তার সেটা বর্জন করে। পণ্য বিপণন যদি সামাজিক পরিবেশের পরিপন্থি হয় তবে ক্রেতারা এর বিপক্ষে কথা বলে। ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণ বিপণন পরিবেশ নিয়ন্ত্রের জন্য অপরিহার্য্য তাই বিপণনকারী, সরকার, ভোক্তা সকলের জন্যই ভোক্তা আচরণের জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য্য।

ভোক্তার আচরণ (Consumer Behavior):
ভোক্তা আচরণের সংজ্ঞা (Definition of consumer behavior) :
যে সকল ব্যক্তি পণ্যসামগ্রী বা সেবাসামগ্রী ভোগ করে তাদেরকে সাধারণত ভোক্তা বলা হয়। যখন কোন ব্যক্তি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ভোগের উদ্দেশ্যে দ্রব্য বা সেবা ক্রয় করে বিপণনে তাকে বলা হয় ভোক্তা। যখন কোন ব্যক্তি নিজের জন্য একটি শার্ট ক্রয় করে তখন তাকে বলা হবে শার্টের ভোক্তা অথব যখন পরিবারের জন্য চাউল কিনবে তখন বলা চাউলের ভোক্তা। ভোক্তার আচরণ হচ্ছে একজন ব্যক্তির সে সমস্ত কার্যক্রমের সমষ্টি, যা দ্বারা পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়। ভোক্তাদের পণ্যসামগ্রী ক্রয় কালে তাদের সাধারণ কতিপয় বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
মূলত পণ্যসামগ্রী ক্রয় কালে ভোক্তার মধ্যে আচরণের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাই ভোক্তার আচরণ। অন্যভাবে বলা যায়, নির্দিষ্ট কোন পণ্য বা সেবা অর্জন, ব্যবহার বা পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে সমস্ত বিষয় সরাসরি প্রভাব সৃষ্টি করে সেগুলোর সমষ্টিই ভোক্তা আচরণ। ভোগ বা ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পণ্য সেবা ক্রয় কালে ভোক্তা বিভিন্ন কার্যাবলী সম্পাদন করে। এসব কার্যাবলী সম্পাদনের ক্ষেত্রে ভোক্তার কিছু আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে যাকে ভোক্তার আচরণ বলে। নিচে ভোক্তার আচরণের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সংজ্ঞা দেয়া হল:
Philip Kotler and Gray Armstrong, “Consumer behavior refers to the buying behavior of final consumer-individuals and households that buy goods and services for personal consumption.” (ভোক্তার ক্রয় আচরণ বলতে চূড়ান্ত ভোক্তার ক্রয় আচরণকে বুঝায় যারা ব্যক্তিগত এবং গৃহস্থালীর কাজের ব্যবহারের জন্য পণ্য বা সেবাসামগ্রী ক্রয় করে)।
লেডিন ও বেটিয়ার মতে, Consumer behavior may be defined as the decision process and physical activity individuals engaged in when evaluating acquiring using or disposing of goods or services. (পণ্য বা সেবা ক্রয় বা ব্যবহার করার সাথে সম্পর্কযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও শারীরিক কার্যাবলীকে সামগ্রিকভাবে ভোক্তার আচরণ বলে।)
Berkman, Consumer behavior is the activities of people engaged in actual or potential use of market items whether products, services, retail environments or ideas. (যে সকল প্রকৃত ও সম্ভাব্য ব্যবহারকারী জনসাধারণ বাজারের পণ্য, সেবা বা ধারণা ব্যবহার করে তাদের কার্যাবলীকে ভোক্তার আচরণ বলে।)
সুতরাং সার্বিক আলোচনা থেকে বলা যায়, শুধুমাত্র ভোগের উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয়ের সাথে সম্পর্কিত আচরণই ভোক্তার আচরণ নয় বরং কোন ব্যক্তি সেবা গ্রহণ কালে যে আচরণ করে তাও ভোক্তার আচরণের আওতাভূক্ত। সংক্ষেপে বলা যায়, ব্যক্তির যে সমস্ত কার্যাবলির সমষ্টি যার দ্বারা পণ্য বা সেবার ক্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয় তাকে ভোক্তার আচরণ বলে। বর্তমান জগতে বিপণন কার্যক্রম পরিচালিত হয় মূলত ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে।
তাই ভোক্তা কোন ধরণের পণ্য ক্রয় করে, কখন ক্রয় করে, কিভাবে ক্রয় করে, কি কি বিষয় ক্রয় সিদ্ধান্ত প্রভাব বিস্তার করে ইত্যাদি বিশ্লেষণ বিপণন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের অপরিহার্য বিষয়। ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণ বিপণন পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য। ভোক্তার আচরণ সম্পর্কে অবগত হওয়ার মাধ্যমে বিপণনকারী ভোক্তার প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী বিপণন কার্যক্রম প্রণয়ন করতে পারে ।

ভোক্তার আচরণে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান (Factors Affecting Consumer Behavior):
বিপণনকারীর প্রধান কাজ হচ্ছে ভোক্তারা কিভাবে পণ্য ক্রয় করে অর্থাৎ কি কি বিষয় ভোক্তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে সেগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করা এবং সেগুলোকে খুঁজে বের করা। কোন একটি বিশেষ পণ্য ক্রয়ে বহুবিধ বিষয় প্রভাব বিস্তার করে। বয়স, আয়, শিক্ষা, রুচি ইত্যাদি বিবিধ কারণে ভোক্তায় ভোক্তায় পছন্দ এবং আচরণে অমিল লক্ষ্য করা যায়। ভোক্তা আচরণের সংজ্ঞা থেকে এটা জানা যায় যে, ভোক্তা যখন পণ্য ক্রয় করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন অনেক বিষয় তার উপর প্রভাব বিস্তার করে।
তবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক উপাদান দ্বারা ভোক্তার ক্রয় আচরণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। এই উপাদানগুলো প্রায় ক্ষেত্রেই বিপণনকারীর পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না তবুও এগুলোকে বিবেচনার মধ্যে রেখে একজন বিপণনকারীকে তার পণ্য ও সেবা বিপণন করতে হয়। পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে যে সকল উপাদান প্রভাব বিস্তার করে সেগুলো চিত্রে দেখানো ও ব্যাখ্যা করা হলো।

১। সাংস্কৃতি উপাদান (Cultural Factors)
সাংস্কৃতিক উপাদান ভোক্তার ক্রয় আচরণের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো ভোক্তার ধর্ম, পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পদ্ধতি এর উপর প্রভাব ফেলে বলে সামগ্রিকভাবে বিপণন কার্যক্রমের উপর প্রভাব বিস্তার করে। এই উপাদানগুলো মূলত বিপণনকারীর অনিয়ন্ত্রিত বিষয় তথাপি এগুলোকে বিবেচনার মধ্যে রেখে বিপণনকারীকে তার পণ্য ও সেবা বিপণন করতে হয়। সাংস্কৃতিক উপাদানের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংস্কৃতি, উপ-সংস্কৃতি এবং সামাজিক শ্রেণী। একজন ভোক্তার ক্রয় আচরণ কিভাবে এই বিষয়গুলো দ্বারা প্রভাবিত হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো :
ক) সংস্কৃতি (Culture):
সংস্কৃতি বলতে সমাজের রীতিসিদ্ধ আচরণকে বুঝায় যা সমাজের প্রথাসিদ্ধ, আচরণ, মূল্যবোধ, প্রচলিত বিশ্বাস এবং রীতিনীতি দ্বারা প্রকাশিত হয়। ভোক্তারা তাদের বিশ্বাস ও অভ্যাস সংস্কৃতি থেকে অর্জন করে। একটি শিশু সমাজে বড় হওয়ার পাশাপাশি তার মূল্যবোধ, আচরণ, অভাব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান এবং পরিবার থেকেই শিখে। আবার সংস্কৃতি পরিবর্তনের কারণে ক্রেতাদের আচরণ ব্যাপকভাবে পরিবর্তীত হচ্ছে। যেমন সংস্কৃতি পরিবর্তনের কারণে আমাদের দেশে ফাস্ট ফুড দিন দিন জনপ্রিয়তা লাভ করছে। একটা দেশের জনগণ কি খাদ্য গ্রহণ করবে, কি পোশাক পরবে, কোন ধরণের পণ্য ভোগ করবে ইত্যাদি বিষয় সংস্কৃতি নির্ধারণ করে থাকে।
মূল্যবোধের কারণে একজন সাধারণ মানুষ গান বাজনা করলেও একজন মসজিদের ইমাম এটা করতে পারে না। ধর্মীয় অনভূতির জন্য মুসলমানদের হালাল-হারাম বিষয়টা বিবেচনায় আনতে হয়। আবার প্রথা বা রীতিনীতির কারণে আমেরিকান মহিলারা স্কাট পছন্দ করলেও বাংলাদেশী মহিলারা শাড়ী অধিক পছন্দ করে ।
খ) উপসংস্কৃতি (Sub-culture):
প্রতিটি সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরণের উপসংস্কৃতি রয়েছে। সাধারণত জাতীয়তাবাদী গ্রুপ, ধর্মীয় গ্রুপ এবং ভৌগোলিক এলাকা দ্বারা উপ-সংস্কৃতির জন্ম হয়। ফলে সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী আলাদা স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হলে তাকে উপসংস্কৃতি বলে। বাংলাদেশী সংস্কৃতিতে ধর্মের ভিত্তিতে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ উপসংস্কৃতি দেখা যায়। মুসলমানের ধর্মীয় কারণে শূকরের মাংস খায় না আবার হিন্দুরা ধর্মীয় কারণে গরুর মাংস খায় না।
আবার খ্রিষ্টানদের কোন ধর্মীয় কোন বিধিনিষেধ না থাকায় এরা গরু ও শূকরের মাংস উভয়টাই খেতে পারে। ফলে প্রত্যেক উপসংস্কৃতিতে পৃথক পৃথক ভোগের ধরণ এবং জীবনধারা পরিলক্ষিত হয়। পেশাভিত্তিক উপসংস্কৃতিও দেখা যায়। এক পেশা থেকে অন্য পেশার লোকদের আচার আচরণ, চিন্তাধারা, জীবনধারা আলাদা হয়ে থাকে। ফলে উপসংস্কৃতি একজন ভোক্তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে।
গ) সামাজিক শ্রেণি (Social class):
মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটি বৃহত্তর গোষ্ঠী যারা প্রায় একই ধরণের জীবনমানসম্পন্ন হয় তাকে সামাজিক শ্রেণী বলা হয়। মর্যাদা, পেশা, আয়, শিক্ষা, সম্পদ ও অন্যান্য উপাদানের সমন্বয়ে ভোক্তার সামাজিক শ্রেণী নির্ধারিত হয়। এছাড়া সমাজে তিনটি লক্ষণীয় সামাজিক শ্ৰেণী দেখা যায় যেমন উচ্চবিত্ত শ্রেণী, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণী। এই শ্রেণীর মানুষের আয় ক্রয় অভ্যাস, রুচি, চিন্তাধারা, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষ পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।
একটি পণ্যের চাহিদা বিশেষ শ্রেণীর নিকট বিশেষ রকমের, যেমন উচ্চবিত্ত শ্রেণীর নিকট একটি গাড়ি প্রয়োজনীয় পণ্য হলেও নিম্নবিত্ত শ্রেণীর নিকট এটি বিলাস দ্রব্য। যেহেতু একই জীবনমানসম্পন্ন লোকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে একটি সামাজিক শ্রেণী সেহেতু বাজার বিভক্তিকরণ ও বিপণন কৌশল নির্ধারণে এবং ক্রেতার ক্রয় আচরণে এ জ্ঞানকে কাজে লাগানো যায়। এর মাধ্যমে জানা যায় কোন শ্রেণী কোন ধরণের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করবে। এজন্য সামাজিক শ্রেণীকে ভোক্তার আচরণের নির্ধারক হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

২। সামাজিক উপাদান (Social Factors)
সামাজিক উপাদান দ্বারাও ভোক্তার ক্রয় আচরণ প্রবাবিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপাদানগুলো হলো নির্দেশক দল, পরিবার, সামাজিক ভূমিকা এবং মর্যাদা। সামাজিক এসকল উপাদান দ্বারা যেহেতু ভোক্তার আচরণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয় তাই একজন বিপণনকারীকে তার পণ্যের বিপণন কৌশল নির্ধারণের সময় এসকল উপাদান বিবেচনায় রাখতে হয়। নিম্নে এই উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো:
ক) রেফারেন্স গ্রুপ বা নির্দেশক দল (Reference group):
এটি এমন একটি দল যেখানে ব্যক্তি সরাসরি ঐ দলের সদস্য না হয়েও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের চাল চলন, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়। অন্যভাবে বলা যায়, কোন বিশেষ গোষ্ঠী দ্বারা সাধারণ ভোক্তাদের পণ্য ক্রয় প্রভাবিত হলে তাদেরকে রেফারেন্স গ্রুপ বলে। দুই ধরণের রেফারেন্স গ্রুপ রয়েছে।
প্রাথমিক রেফারেন্স গ্রুপ:
এটি ঐ ধরণের দল যার সদস্য পরিবারের যে কেউ হতে পারে। আবার বন্ধুবান্ধবও হতে পারে। এ ছাড়াও চিত্র তারকা, প্রসিদ্ধ খোলোয়াড়, রাজনৈতিক নেতা এরাও এ দলের অন্তর্ভুক্ত।
মাধ্যমিক রেফারেন্স:
এটি এমন একটি দল যেখানে প্রাথমিক দলের মত ব্যক্তিরা জড়িত নয়। মাধ্যমিক দলের মধ্যে আছে বড় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি। রেফারেন্স গ্রুপ ভোক্তার ক্রয় আচরণের গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। কারণ এরূপ গ্রুপগুলো তাদের মনোভাব, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, দর্শন ইত্যাদি উন্নয়নের মাধ্যমে ভোক্তার ক্রয় আচরণে প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। তাছাড়া এরূপ গ্রুপগুলোর সঙ্গে মুখোমুখি ব্যক্তিগতভাবে আলাপ আলোচনা বিজ্ঞাপন অপেক্ষা অধিক প্রভাব সৃষ্টিকারক হিসেবে গণ্য হয়। এ সমস্ত কারণে বিপণনকারী বিপণন কৌশল হিসেবে রেফারেন্স গ্রুপকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে ।

খ) পরিবার (Family):
রক্তসম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্কের সূত্র ধরে দুই বা ততোধিক সংখ্যক লোক যখন একত্রে বসবাস করে তখন তাকে পরিবার বলা হয়। পরিবারে সদস্যরা একে অন্যকে পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে প্রভাবিত করে থাকে। আবার পরিবারে সদস্যরা বিভিন্ন ভাবে পণ্য ক্রয়ের সময় বিভিন্ন ধরণের ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিবারের পিতা, মাতা, ভাই, বোন বা বয়স্ক সদস্যরাও ভোক্তার ক্রয় আচরণে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পণ্য শ্রেণী এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার স্তর ভেদে পরিবারের ক্রয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
পণ্য ক্রয়ে পরিবারের প্রতিটি সদস্য বিভিন্নমুখী ভূমিকা রাখে। আসবাবপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রসাধনী সামগ্রী ক্রয়ের সময় স্ত্রীর ভূমিকা বেশি থাকে। খেলাধুলা সামগ্রী ক্রয়ে সন্তানদের প্রাধান্য বেশি থাকে। জমি এবং মূল্যবান পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিবারের বয়স্কদের প্রাধান্য দেয়া হয়। একই পরিবারে বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন পেশার বা বিভিন্ন আয় সম্পন্ন সদস্যদের সমাবেশ ঘটে বলে ভোক্তার ক্রয় আচরণ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের দ্বারাও প্রভাবিত হয়।
গ) ভূমিকা ও মর্যাদা (Role and status):
ভূমিকা এবং মর্যাদা দ্বারা ভোক্তার সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়। কোন পরিবারে ব্যক্তির ভূমিকা এবং পদমর্যাদা বলতে তার কর্মদক্ষতা এবং নিজস্ব ভূমিকাকে বুঝায়। যদি পরিবারের কোন সদস্য কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ হন তবে কম্পিউটার ক্রয়ের ক্ষেত্রে তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবে। আবার পরিবারে কোন সদস্য যদি ডাক্তার হয় তবে চিকিৎসা ও ঔষধের ব্যাপারে তার ভূমিকা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
আবার একজন মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরণের ভূমিকা পালন করে। যেমন- একজন মানুষ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, ক্লাব সভাপতি, খোলোয়াড়, সঙ্গীত শিল্পী, পিতা, স্বামী বা নেতা ইত্যাদি ভূমিকা পালন করতে পারে। এই ব্যক্তির প্রতিটি ভূমিকার পদমর্যাদা ভিন্ন। তাই তার প্রতিটি ভূমিকায় ক্রয় আচরণও ভিন্ন হবে।

৩। ব্যক্তিগত উপাদান (Personal Factors):
ভোক্তার ক্রয় আচরণের প্রভাব বিস্তারকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোক্তার ব্যক্তিগত উপাদান। ভোক্তার ব্যক্তিগত উপাদান যেমন ক্রেতার অভ্যাস, পেশা, আয়, আত্মমর্যাদা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবনধারা, নিজস্ব ধারণা ইত্যাদি ভোক্তার ক্রয়ে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। নিম্নে একজন ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্তে প্রভাববিস্তারকারী ব্যক্তিগত উপাদানসমূহের বর্ণনা দেয়া হলো :
ক) বয়স ও জীবনচক্র (Age and life cycle):
বয়সের পার্থক্য এবং পারিবারিক জীবনচক্রের কারণে ভোক্তার অভ্যাস, রুচি, পছন্দ ইত্যাদিতে তারতম্য সৃষ্টি হয়। বয়সের পার্থক্যের কারণে দ্রব্য ও সেবা ক্রয়ে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একজন শিশু ও একজন বৃদ্ধ মানুষের ক্রয়ে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একজন স্কুল ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের ক্রয় আচরণ ভিন্ন হয়ে থাকে। এছাড়া পরিবারে জীবনচক্র দ্বারাও তাদের ক্রয় আচরণ প্রভাবিত হয়। পরিবারে জীবনচক্র যেমন- অবিবাহিত যুবক, নববিবাহিত, বিবাহিত দম্পতি (সন্তানসহ), বিবাহিত দম্পতি (সন্তান ছাড়া), স্বামী বা স্ত্রী একা ইত্যাদি স্তরগুলো বিভিন্ন ভাবে ক্রয় আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
খ) পেশা (Occupation):
ব্যক্তির পেশা নির্দিষ্ট দ্রব্য ও সেবাসমূহের চাহিদার দিকে ধাবিত করে। পেশাগত ভিন্নতার জন্য পণ্য ক্রয় আচরণে ভিন্নতা দেখা দেয়। যেমন- একজন হিসাব রক্ষকের নিকট ক্যালকুলেটরের চাহিদা থাকলেও একজন দিনমজুরের নিকট এরূপ পণ্যের প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। পেশাগত কারণে সেনাবাহিনীতে কর্মরত মানুষদের সাথে শিক্ষক বা ডাক্তারদের জীবনযাত্রার অনেক বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় যা তাদের ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে থাকে ।
গ) ব্যক্তিত্ব (Personality):
ব্যক্তিত্ব বলতে সাধারণত ব্যক্তির দোষ গুণ বিশ্বাস, মনোভাব, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, আবেগ, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির সামগ্রিক রূপকে বুঝায়। প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব থাকায় তাদের ক্রয় আচরণেও ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। তাছাড়া পণ্য এবং পণ্যের ব্র্যান্ড নির্ধারণেও ব্যক্তিত্বের ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। একজন সৎ কর্মকর্তা এবং একজন অসৎ কর্মকর্তার ক্রয় আচরণ একরকম হয় না। তাই বিপণনকারীকে ক্রেতাদের ব্যক্তিত্বের দিকে লক্ষ্য রেখে তার পণ্য বাজারে ছাড়তে হয়। ফলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে।
ঘ) অর্থনৈতিক অবস্থা (Economical situation) :
ব্যক্তির অর্থনৈতিক অবস্থা তার পণ্য ও সেবা ক্রয়ে প্রভাব বিস্তার করে। অর্থনৈতিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ চলকগুলো হলো: ব্যক্তির আয়, ব্যক্তির সঞ্চয় ও সম্পত্তি, ব্যক্তির ঋণ গ্রহণ ক্ষমতা, ব্যয় ও সঞ্চয়ের প্রতি মনোভাব ইত্যাদি। ভোক্তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা তার পণ্য ক্রয়ে প্রভাব বিস্তার করে। গরীব এবং ধনী মানুষের ক্রয় আচরণে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। ফলে বিপণনকারীকে অর্থনৈতিক চলকসমূহ গভীর ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী তার পণ্য বাজারে ছাড়তে হবে।
ঙ) জীবনযাপন প্রণালী (Lifestyle) :
একজন ব্যক্তির জীবনধারা তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। দুইজন ডাক্তারের বা দুইজন শিক্ষকের জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। একজন ডাক্তার খুবই মিতব্যয়ী হতে পারে অন্য দিকে আর একজন ডাক্তার বেহিসেবী হতে পারে। একজন শিক্ষক বিলাস দ্রব্য পছন্দ করলেও অন্য একজন শিক্ষক বিলাস দ্রব্য অপছন্দ করতে পারে। তাই বিপণনকারীকে পণ্য অথবা পণ্যের ব্র্যান্ড এবং জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে সম্পর্ক বিবেচনার প্রয়োজন হয়। প্রায় সময় দেখা যায় যে একই শ্রেণীর ক্রেতাদের মধ্যে ফ্যাশন পরিবর্তনের কারণে এক শ্রেণীর মানুষের ভোগের পরিবর্তন হলেও অন্য শ্রেণীর মানুষ ফ্যাশন পরিবর্তনে আগ্রহী হয় না ।

৪। মনস্তাত্ত্বিক উপাদান (Psychological Factors)
একজন ব্যক্তির ক্রয় আচরণে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত উপাদান যেমন প্রবাব বিস্তার করে তেমনি মনস্তাত্ত্বিক উপাদানও প্রভাব বিস্তার করে। একজন ব্যক্তির ক্রয় পছন্দ ৪টি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়। উপাদানগুলো হচ্ছে প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ, ও মনোভাব। এরূপ উপাদানগত আচরণ অভিজ্ঞতার মাধ্যমে ভোক্তার অর্জন করে এবং পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। নিম্নে এই উপাদানগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
ক) প্রেষণা (Motivation):
ভোক্তার আচরণের ক্ষেত্রে প্রেষণা হচ্ছে এমন একটি তাড়না যা ভোক্তাকে তার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে একটি নির্দিষ্ট পণ্যের ব্র্যান্ড পছন্দ করতে তাড়িত করে। পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক ক্রেতারই ভিন্ন ভিন্ন মোটিভ কাজ করে। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এইরূপ উদ্দেশ্যেরও পরিবর্তন ঘটে। প্রেষণা ও চাহিদা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। প্রেষণার ক্ষেত্রে বিভিন্ন চাহিদার কথা বলা হয়েছে। এখানে দুটো চাহিদা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
i) মাসলোর চাহিদা সোপান তত্ত্ব (Maslow’s need hierarchy theory):
মাসলোর মতে, মানুষ তার চাহিদাগুলোর তীব্রতা অনুযায়ী ক্রমাগতভাবে প্রয়োজন অনুভব করে এবং পূরণ করতে সচেষ্ট হয়। তীব্র চাপ সৃষ্টিকারী প্রয়োজন প্রথমে থাকে এবং ক্রমে ক্ষীণ চাপ সৃষ্টিকারী প্রয়োজনগুলো স্থান পায়। তিনি মানুষের চাহিদাগুলোকে ৫টি ভাগে ভাগ করেছেন। নিম্নে চিত্রে চাহিদা সোপান দেখানো ও ব্যাখ্যা করা হলো :
- দৈহিক চাহিদা (Physiological needs): বেঁচে থাকার জন্য মানুষ যে সকল চাহিদার অনুভব করে তাকে দৈহিক চাহিদা বলা হয়। যেমন- খাদ্য, বস্ত্র, অক্সিজেন, ঘুম ইত্যাদি।
- নিরাপত্তার চাহিদা (Safety needs): দৈহিক চাহিদা পূরণ হলে মানুষ নিরাপত্তার চাহিদা অনুভব করে। মানুষের খাদ্যের চাহিদা পুরণ হলে মানুষ পুষ্টিকর ও পরিচ্ছন্ন খাবারের চাহিদা অনুভব করে ।
- ভালোবাসার চাহিদা (Social need): নিরাপত্তার চাহিদা পূরণ হবার পর মানুষ পরস্পর পরস্পর থেকে ভালোবাসা, স্নেহ এবং সহানুভূতি আশা করে।
- পদমর্যাদার চাহিদা (Esteem need): ভালবাসার চাহিদা পূরণের পর মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে সম্মান ও প্রতিপত্তিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মানুষ তার নিজস্ব সুখ-শান্তি ও আত্মতৃপ্তির মাধ্যমে জীবনকে উপভোগ করতে চায়।
- আত্ম-পূর্ণতার চাহিদা (Self-actualization) : পদমর্যাদার চাহিদা পূরণ হলো মানুষ আত্ম-পূর্ণতার চাহিদা অনুভব করে। যেমন- নিজের নামে স্কুল বা কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষ অমরত্ব লাভ করতে চায়।

ii) ফ্রয়েডে এর প্রেষণা তত্ত্ব (Freud’s theory ofmotivation) :
ফ্রয়েডের মতে, মানুষ তার আচরণকে রূপদানকারী প্রকৃত মনস্তাত্ত্বিক শক্তিগুলো সম্পর্কে ব্যাপকভাবে অবচেতন। মানুষ বড় হওয়ার পাশাপাশি তার মনে অনেক মোটিভ অবদমিত থেকে যায় যা তার মন থেকে বাদ দেয়া যায় না। ফলে দেখা যায় মানুষ কতিপয় তাড়নাকে অবদমিত করে আস্তে আস্তে বড় হয়। যে ছাত্রটি পায়ে হেঁটে স্কুল বা কলেজের জীবন শেষ করেছে তার মনে একটি মটরসাইকেল পাবার বিষয়টি অবদমিত থেকে যায়।
সেই কারণে সে তার ছেলের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে মটর সাইকেল উপহার দিয়ে নিজের অবদমিত মোটিভ পূর্ণ করে। তাই মানুষের বাহ্যিক কর্মকলাপ সম্পর্কে জানা গেলেও কি উদ্দেশ্যে কি আচরণ করে তা জানা যায় না। সেই কারণে যে পণ্যটি ক্রেতাকে আকর্ষিত করছে তার সম্পর্কে বিজ্ঞাপনকারীকে অবহিত হতে হয়।
খ) প্রত্যক্ষণ (Perception):
মানুষ তার পঞ্চ ইন্দ্রেয়ের সাহায্যে পরিবেশ থেকে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে এবং যেভাবে প্রতিক্রিয়া করে তাকে প্রত্যক্ষণ বলা হয়। নাক দিয়ে পচা খাবারের গন্ধ পেলে সেই খাবার ক্রয় থেকে আমরা বিরত থাকি । হাত দিয়ে কোন কাপড়ের জমিন পরীক্ষা করার পরই সেই কাপড় ক্রয় করে থাকি। ফলে দেখা যাচ্ছে পণ্যের আকার, রং, শব্দ, গঠন, গন্ধ, স্বাদ ইত্যাদি দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে ভোক্তারা পণ্য ক্রয় করে। তাই ভোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরণের উদ্দীপক ব্যবহার করা প্রয়োজন।
সেই কারণে চাইনজ রেস্টুরেন্টে সুন্দর গান অথবা কাপড়ের দোকানে ডেকোরেটেড লাইট ব্যবহার করা হয়। প্রত্যক্ষণের বিষয়ে বিপণনকারীকে যথেষ্ট সজাগ থাকতে হয় কারণ দুইজন ব্যক্তির প্রত্যক্ষণে ভিন্নতা দেখা দেয়। একই ব্র্যান্ড দুজন ব্যক্তি দুইভাবে প্রত্যক্ষণ করে থাকে। পণ্যের উচ্চ মূল্যকে কেউ উচ্চ গুণের পণ্য হিসেবে প্রত্যক্ষণ করে আবার কেউ প্রতারণা হিসেবে প্রত্যক্ষণ করে। প্রত্যক্ষণের মধ্যে দুইটি উপাদান রয়েছে।
উদ্দীপক উপাদান: এই উপাদানের মধ্যে রয়েছে রং, আকার, গতি, গন্ধ, অবস্থান, বিচ্ছিন্নতা, তীক্ষ্ণতা, বৈষম্য ইত্যাদি।
প্রতিক্রিয়াকামী উপাদান: এই উপাদানের মধ্যে রয়েছে ব্যক্তির আগ্রহ, চাহিদা, মনোযোগ, মূল্যবোধ ইত্যাদি। উপরের সকল উপাদানের সাথে প্রত্যক্ষণের সক্রিয় সম্পর্ক রয়েছে। ভোক্তাদের ক্রয় আচরণে এই উপাদানগুলো যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
গ) শিক্ষণ (Learning) :
শিক্ষা ভোক্তা আচরণের একটি মৌলিক উপাদান যা ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষের আচরণের অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনকে শিক্ষণ বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায় নতুন কোন ধারণা, পদ্ধতি বা আচরণ আয়ত্ব করাই শিক্ষণ। মানুষের বেশিরভাগ আচরণই শিক্ষালব্ধ। যেমন বলা যায়, যে ব্যক্তির কম্পিউটার সংক্রান্ত জ্ঞান রয়েছে এবং যে ব্যক্তির জ্ঞান নেই তাদের কম্পিউটার ক্রয়ের ক্ষেত্রে আচরণগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বিপণনকারী শিক্ষণের দুটো ধারণাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করে যা সরাসরি ভোক্তার ক্রয় আচরণে প্রভাব বিস্তার করে ।
i) সরলীকরণ (Generalization):
ক্রেতারা সাধারণত একই ধরণের উদ্দীপকের প্রতি একই ধরণের সাড়া প্রদান করে থাকে। সেই কারণে বিপণনকারীকে বিজ্ঞাপনে সরাসরি পণ্য ক্রয়ের আবেদন সৃষ্টিকারী বিজ্ঞাপন প্রদান করতে হবে।
ii) বৈষম্যকরণ (Discrimination):
একই উদ্দীপক বিভিন্ন ক্রেতা বিভিন্ন ধরণের সাড়া প্রদান করতে পারে। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন কোম্পানির গুড়ো হলুদ ক্রেতারা বিভিন্ন ভাবে প্রত্যক্ষণ করে থাকে।
ঘ) বিশ্বাস এবং মনোভাব (Beliefs and attitudes):
মানুষের আচরণ বিশ্বাসেরই একটি অংশ। কোন পণ্য বা ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি তৈরিতে বিশ্বাস কাজ করে। জাপানী পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে ক্রেতাদের বিশ্বাস ইতিবাচক। চায়না পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে ক্রেতাদের বিশ্বাস নেতিবাচক। এখন চায়না কোম্পানিগুলো যদি পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি করতে চায় তবে বাজারে ক্রেতাদের বিশ্বাস পরিবর্তন করতে হবে। অন্যদিকে কোন বিশেষ পদ্ধতিতে কাজ করার মানসিক প্রস্তুতিকে মনোভাব বলা হয়। যদিও মনোভাব এবং বিশ্বাস পরস্পর সম্পর্কযুক্ত, ধর্ম, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ের উপর মানুষের নিজস্ব মনোভাব রয়েছে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের প্রতি মানুষের নিজস্ব মনোভাব রয়েছে।
যদি ক্রেতা সাধারণের কোন ব্র্যান্ডের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব থাকে তবে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ক্রেতার মনোভাব ইতিবাচক করতে হবে। আবার কোন ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতাদের ইতিবাচক মনোভাব থাকলে বিপণনকারী পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে বাজার বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে ভোক্তার মনোভাব পর্যালোচনা করে বিপণনকারীকে বিভিন্ন ধরণের বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

ভোক্তার ক্রয় আচরণ ও প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান বিষয়ের সারসংক্ষেপ:
ভোক্তার আচরণ হচ্ছে ব্যক্তির সে সমস্ত কার্যাবলীর সমষ্টি যা দ্বারা পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হয়। ভোক্তারা কি ধরণের পণ্য ক্রয় করে, কেন ক্রয় করে, কিভাবে ক্রয় করে, কখন ক্রয় করে, কোথা থেকে ক্রয় করে, কি কি উপাদান ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্তে প্রভাব সৃষ্টি করে ইত্যাদি বিশ্লেষণ সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থার পূর্বশর্ত। ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধান করার জন্য ভোক্তা আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপণনকারীর প্রধান কাজ হচ্ছে ভোক্তারা কিভাবে পণ্য ক্রয় করে অর্থাৎ কি কি বিষয় ভোক্তার ক্রয় আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে সেগুলোকে বুঝতে চেষ্টা করা। ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্তে অনেক | বিষয় প্রভাব বিস্তার করে থাকে।
তবে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদান দ্বারা ভোক্তার ক্রয় আচরণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো ভোক্তার ধর্ম, পরিবার, শিক্ষা এবং সামাজিক পদ্ধতি এর প্রভাব ফেলে বলে সার্বিকভাবে বিপণন কার্যক্রমের উপরও প্রভাব সৃষ্টি করে থাকে। সামাজিক উপাদানসমূহ যেমন- রেফারেন্স, | গ্রুপ, পরিবার, ভূমিকা ও মর্যাদা ক্রেতার ক্রয় আচরণের উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। তাছাড়া ব্যক্তিগত ও মনোস্তাত্ত্বিক উপাদানসমূহ ব্যাপক ভাবে ক্রেতার ক্রয় আচরণের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে । একজন বিপণনকারীকে ক্রেতা আচরণের উপর প্রভাব বিস্তারকারী উপাদানসমূহ নিয়মিত ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয় এবং সেই অনুযায়ী বিপণন কৌশল প্রণয়ন করতে হয়।

১ thought on “ভোক্তার ক্রয় আচরণ ও প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান”