ভোক্তা আচরণ

ভোক্তা আচরণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “ভোক্তা ও ব্যবসায় বাজার ও ক্রেতার আচরণ” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ভোক্তা আচরণ

 

বিপণনে ভোক্তা এবং ক্রেতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বিপণনকারী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। ইউনিট ১ এ ক্রেতা ও ভোক্তার সংজ্ঞা ইতিমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিদিনই ক্রেতাকে বিভিন্ন ক্রয় সিদ্ধান্ত নিতে হয় আর যেকোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে এই ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত। অনেক বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানই ক্রেতা কী ধরণের পণ্য ক্রয় করে, কখন ক্রয় করে, কোথা থেকে ক্রয় করে, কত দামে ক্রয় করে, কত পরিমাণে ক্রয় করে, কেনো ক্রয় করে ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করার জন্য গবেষণা করে।

 

ভোক্তা আচরণ

Consumer Behavior

ভোক্তা বাজার হলো ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ও সেবাসমূহ ক্রয় বা সংগ্রহ করে এমন সকল ব্যক্তি ও পরিবারের সমষ্টি। প্রত্যেক ভোক্তাই পণ্য বা সেবা ক্রয়, অর্জন, ভোগ, ব্যয়, হার বা বর্জনের সময় নিজস্ব প্রকৃতিসুলভ বিভিন্ন ধরনের মনোভাব বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। পণ্যসামগ্রী বা সেবাকর্ম ক্রয়ের সময় একজন ক্রেতা যে সকল কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে সে সকল কাজের সাথে সম্পর্কিত সকল আচরণকে ভোক্তার আচরণ বলে ।

Philip Kotler & Gary Armstrong ভোক্তা আচরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “Consumer buying behavior refers to the buying behavior of final consumers-individual and households who buy goods and services for personal consumption.” অর্থাৎ ভোক্তার ক্রয় আচরণ হলো চূড়ান্ত ভোক্তা-নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের ক্রয় আচরণ যারা ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ও সেবাসমূহ ক্রয় করে । Skinner ভোক্তা আচরণের যে সংজ্ঞা প্রদান করেছেন তা হলো, “Consumer behavior is the activity and decision process of people who purchase goods and services for personal consumption.” ভোক্তার আচরণ হলো সেসব ব্যক্তির কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া যারা ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ও সেবাসমূহ ক্রয় করে।

প্রত্যেক ভোক্তা বা ক্রেতাই ভিন্ন ভিন্ন। একই পণ্য ক্রয় করার সময় একজন ক্রেতা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতে পারে। একারণে ভোক্তা আচরণ বিপণনকারীর জন্য কঠিন, একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সুতরাং ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে বলা যায় যে, পণ্যদ্রব্য ও সেবা সামগ্রী নির্বাচন, ক্রয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তব ক্রয় এবং ভোগ বা ব্যবহারের সময় ভোক্তা যে আচরণ করে থাকে তাকেই ভোক্তা আচরণ বলা হয়। যেমন: একজন ব্যক্তির কাছে মোবাইল ফোন ক্রয় করার সময় ফোনের মূল্যকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আবার, অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে মোবাইলের ফোনের মডেল ও ডিজাইন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রয়োজনের পার্থক্যের কারণে একই পণ্যের প্রতি দুইজন ব্যক্তির আচরণের পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তাই বিপণনকারীকে ক্রেতার ও ভোক্তার ক্রয় আচরণ সম্পর্কে জানা গুরুত্বপূর্ণ।

 

ভোক্তা আচরণের মডেল

Model of Consumer Behavior

ভোক্তার আচরণ প্রক্রিয়াতে যে বিষয়সমূহ নিয়মিত ঘটে তার সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনকে ভোক্তা আচরণের মডেল বলে। ক্রয় প্রক্রিয়াতে ভোক্তারা বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্তগ্রহণ করে থাকে। কোন পণ্যটি ক্রয় করবে, কখন ক্রয় করবে, কতগুলো ক্রয় করবে, কোন সময় ক্রয় করবে, কোথা হতে ক্রয় করবে; ভোক্তাদের এ মৌলিক বিষয়গুলো সম্বন্ধে বিপণনকারী সবসময়ই জানার চেষ্টা করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে বিপণন কার্যক্রম নির্ধারণ করে। কারণ এ তথ্যগুলো জানা হলে বিপণনকারী বুঝতে পারে পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মূল্য, বিজ্ঞাপণের আবেদন ইত্যাদির প্রতি ভোক্তারা কীভাবে সাড়া দিতে পারে।

ফলে অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বিপণনকারী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে। এ জন্য বিপণনকারী ভোক্তা আচরণ মডেলের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে। চিত্র নং ৪.১ এ ভোক্তা আচরণের একটি মডেল উপস্থাপন করা হলো-

 

 

চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বিপণন উদ্দীপক কীভাবে ক্রেতার জগতে বা ব্ল্যাক বক্সে প্রবেশ করে এবং এর ফলে ক্রেতার মাঝে কীভাবে নির্দিষ্ট সাড়া সৃষ্টি হচ্ছে। এ মডেলের উপাদানসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো-

১. বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপক (Marketing and Other Stimuli): বিপণন উদ্দীপক বলতে বিপণন মিশ্রণের চারটি মূল উপাদান যেমন- পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রসারকে বোঝানো হয়েছে যা বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিপণনকারী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে; যেমন-পণ্যের গুনগত মান, মূল্য পরিবর্তন অথবা আক্রমণাত্মক প্রসার কৌশলের মাধ্যমে ভোক্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যান্য উদ্দীপকসমূহ বিপণনকারী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কিন্তু এ উদ্দীপকসমূহ যে কোনো সময় ক্রেতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ ।

২. ক্রেতার ব্ল্যাকবক্স ( Buyer’s Black box ) : বিপণন উদ্দীপকসমূহ বিভিন্নভাবে ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও নিজের বৈশিষ্ট্য (Buyer’s Psychology and Characteristics) দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। ক্রেতা তার নিজস্ব বিবেচনায় এই উদ্দীপকগুলোকে মূল্যায়ন করে। একজন ক্রেতা থেকে অন্য ক্রেতার মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে কেবলমাত্র তাদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে। একজন ক্রেতা কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনকে সৃষ্টিশীল মনে করতে পারেন, অন্যদিকে আর একজন ক্রেতা একই বিজ্ঞাপনকে বিরক্তিকর মনে করতে পারেন। ক্রেতার মানসিকতা তার প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ ও আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। ক্রেতা যে সংস্কৃতি, উপ-সংস্কৃতি ও সামাজিক শ্রেণিতে অবস্থান করে তার ওপর নির্ভর করে ক্রেতার বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। এসব কিছুই ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও সাড়ায় প্রভাব বিস্তার করে ।

৩. ক্রেতার প্রতিক্রিয়া (Buyer’s Responses ) : বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপক এবং ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্রেতা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এ প্রতিক্রিয়াসমূহ ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক হতে পারে। ক্রেতার সাড়া বিভিন্ন রকম হতে পারে যেমন: পণ্য পছন্দ, ব্র্যান্ড পছন্দ, ডিলার পছন্দ, ক্রয়ের সময়, ক্রয়ের পরিমাণ ইত্যাদি। সাধারণত ক্রেতা নতুন পণ্য ক্রয়ের সময় পাঁচটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। ক্রেতা সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। তাই ক্রেতা প্রথমত পণ্য ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সনাক্ত করে।

এরপর প্রয়োজন পূরণের জন্য কোন কোন পণ্য বাজারে রয়েছে সেই সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করে । বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ক্রেতা যেসব পণ্য বা ব্র্যান্ডের নাম জানতে পারে তাদের মধ্যে মূল্যায়ন করে বোঝার চেষ্টা করে কোন বিকল্প পণ্যটি তার জন্য যথোপযুক্ত হবে। মূল্যায়নের পর ক্রেতা নির্দিষ্ট পণ্য কোনো স্থান থেকে, কত মূল্যে পণ্য ক্রয় করবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সর্বশেষে, পণ্য ক্রয় করার পর ক্রেতা তার প্রত্যাশা অনুযায়ি পণ্য থেকে কতটা সুবিধা বা উপযোগিতা পেয়েছে তার মধ্যে তুলনা করে। এ তুলনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ক্রেতার সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি নির্ধারিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি ধনাত্মক বা ঋণাত্মক মনোভাব ও আচরণ তৈরি হয়।

ভোক্তা আচরণের প্রভাবকসমূহ

Influencing Factors on Consumer Behavior

বিভিন্ন প্রভাবক- সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা ভোক্তার ক্রয় জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। এ উপাদনগুলো চিত্র ৪.২ এ দেখানো হলো-

 

 

যেকোনো পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়সমূহ প্রভাব বিস্তার করে। বিভিন্ন ক্রেতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে থাকে। এ উপাদানসমূহ বেশির ভাগই বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও এ বিষয়গুলি বিবেচনার মধ্যে এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

১. সাংস্কৃতিক উপাদান (Cultural Factors): ভোক্তা আচরণের ওপর সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যাপক এবং গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে ।

ক) সংস্কৃতি (Culture): সমাজের রীতিসিদ্ধ আচরণকে সংস্কৃতি বলে। সংস্কৃতি দ্বারা মানুষের অভাব এবং আচরণ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। একটি শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে মৌলিক মূল্যবোধ, আচরণ, প্রত্যক্ষণ ইত্যাদি শিক্ষার মাধ্যমে সংস্কৃতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে । এক এক সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন: বাংলাদেশের সংস্কৃতি অনুযায়ি বাংলাদেশিরা মাছ-ভাত খেতে পচ্ছন্দ করে, শাড়ি-লুঙ্গি পরিধান করে, বাংলা ভাষায় কথা বলে। বিপণনকারী সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করে নতুন পণ্যের চাহিদা পূর্বানুমান করার চেষ্টা করছে। তাই বলা যায়, ক্রেতারা কীভাবে ক্রয় করবে, কীভাবে মূল্য পণ্য ক্রয় করবে, কোন পণ্য ক্রয় করবে, কোন ধরনের বণ্টন পদ্ধতি গ্রহণ করবে, ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ দেশের সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয়।

খ) উপ-সংস্কৃতি (Subculture): যেকোনো সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরনের উপসংস্কৃতি রয়েছে। ধর্ম, পেশা, সম্প্রদায়, জাতীয়তাবোধ, বয়স, অঞ্চল ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সংস্কৃতিকে বিভিন্ন উপ-সংস্কৃতিতে বিভক্ত করা যায়। বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে বিভিন্ন প্রকার উপ-সংস্কৃতিতে বিভক্ত করা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে চার ধরনের উপ-সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায় যেমন- মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। মুসলিমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ আর, হিন্দুরা পূজা উদযাপন করে। ধর্মের পার্থক্যের কারণে ক্রেতাদের ক্রয় আচরণের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। সুতরাং উপ-সংস্কৃতিও একজন ভোক্তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে।

গ) সামাজিক শ্রেণি (Social Class): সমাজে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির মানুষের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য এবং গুনাবলী রয়েছে। এ সকল বিষয় তার ক্রয় আচরনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সাধারণত আয়, পেশা, শিক্ষা, সম্পদ, মূল্যবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণে সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয়। সাধারণত সমাজ কাঠামোকে উচ্চবিত্ত শ্রেনী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ও নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এ সকল শ্রেণির মধ্যে আয়, রুচি, ভোগ, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ বিত্ত শ্রেণির মানুষ বসবাসের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয় করে অন্যদিকে নিম্নবিত্তের মানুষ থাকার জন্য সাধারণ বাসা ভাড়া বা ক্রয় করে থাকে।

২. সামাজিক উপাদান (Social Factors): সামাজিক উপাদান দ্বারাও ভোক্তার ক্রয় আচরণ প্রবাবিত হয়। সামাজিক উপাদানের প্রধান বিষয়গুলো হলো দল, পরিবার, সামাজিক ভূমিকা এবং মর্যাদা। সামাজিক এ সকল উপাদান দ্বারা যেহেতু ভোক্তার ক্রয় আচরণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয় তাই একজন বিপণনাকারীকে তার পণ্যের বিপণন কৌশল নির্ধারণের সময় এ সকল উপাদান বিবেচনায় রাখতে হয়।

ক) দল (Groups): একজন ব্যক্তির আচরণ অনেকগুলো ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র দল দ্বারা প্রভাবিত হয়। কোনো ব্যক্তির নির্দেশক দল (Reference Groups) হলো এমন কতগুলো দলের সমষ্টি যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যক্তির আচার আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তির ওপর দুই ধরনের দল প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। তারা হলো প্রথমত, প্রাথমিক দল (Primary Groups) – যারা নিয়মিত এবং অনানুষ্ঠানিক ভাবে মেলামেশা করে। যেমন: পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী ইত্যাদি। অন্যটি হলো মাধ্যমিক দল (Secondary Groups) যাদের সাথে নিয়মিত ভাবে যোগাযোগ হয় না বা অনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়ে থাকে।

যেমন: ধর্মীয় দল, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি। নির্দেশক দলে পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে কাঙ্খিত দল (Aspirational Groups), বিচ্ছিন্নতা দল (Dissociative Groups) ও মতামতে নেতৃত্বদানকারী দল (Opinion Leader Groups)। কাঙ্খিত দলের সদস্যরা হলো প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি বা গোষ্ঠি যাদের দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তির মনোভাব, মূল্যবোধ এবং আচরণ প্রভাবিত হয়। যেমন: বাংলাদেশের একজন কিশোর সাকিব আল হাসানের মতো ক্রিকেট খেলতে চায়। সাকিবের সাথে তার কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগ না থাকলেও সে সাকিবকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে ।

এক্ষেত্রে কাঙ্খিত দলের একজন হিসেবে সাকিব আল হাসান কিশোরটির উপর প্রভাব বিস্তার করছে। অন্যদিকে, ব্যক্তি যখন কোনো দলের মনোভাব বা মূল্যবোধকে অপচ্ছন্দের কারণে পরিত্যাগ করে তখন সেই দলকে বিচ্ছিন্নতা দল বলে। আবার, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের পারদর্শিতা ও সমাজে সক্রিয় অবস্থানের কারণে ভোক্তা কোনো পণ্য ক্রয় করার জন্য বা ক্রয় করা থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ বা প্রভাব বিস্তার করে তখন সেই ব্যক্তি বা দলকে মতামতে নেতৃত্বদানকারী দল বলা হয়। যেমন: একজন ডেন্টিস্ট বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে ভোক্তা যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট ব্যবহার করে।

সুতরাং নির্দেশক দল একজন ভোক্তার ওপর কোন ধরনের আচরণ সে করবে, ভোগের প্রকৃতি কি হবে, কোন ধরনের পণ্য ক্রয় করবে ইত্যাদি বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে ।

খ) সামাজিক নেটওয়ার্ক (Social Network) : অনেক সময়ই বিপণনকারীর বিজ্ঞাপন বা বিক্রয় প্রতিনিধির প্রতিশ্রুতির তুলনায় কাছের বিশ্বস্ত মানুষের কথাকে ক্রেতা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। পরিবার, বন্ধু- বান্ধব বা অন্যকোনো ক্রেতার ব্যক্তিগত কথা বা অনুরোধের জন্য ক্রেতার উপর শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারে, একেই বাংলায় ‘মুখের কথা’ বা Word of Mouth (WoM)- এর প্রভাব বলা হয়। আবার, গুঞ্জন বিপণন (Buzz Marketing) এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্র্যান্ড মুখপাত্র (Brand Ambassador) সৃষ্টি করা হয় বা তাদের তালিকা তৈরি করা হয়, যারা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বা তার পণ্য সম্পর্কে কথা ছড়িয়ে দেয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে এখন অনলাইনে বিভিন্ন দল বা কমিউনিটির মাঝে বিভিন্ন তথ্য বা মতামত খুব সহজে ও দ্রুত আদান-

প্রদান হচ্ছে। যেমন: ফেসবুক (Facebook), ইন্সাটাগ্রাম ( Instagram), টুইটার (Twitter), লিংকডইন (Linkedin) ইত্যাদি। বর্তমান সময়ের বিপণনকারী তাই এই অনলাইন সামাজিক মাধ্যমগুলোর উপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

গ) পরিবার (Family): সাধারণত পরিবারের বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান সদস্যরা একে অপরের ক্রয় আচরণে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে বিপণনকারীকে পরিবারের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। যেমন: কোনো পরিবারে সাধারণত স্ত্রী বা মা সেই পরিবারের জন্য খাদ্য ও পোশাক ক্রয়ের বিষয়ে মূখ্য প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে। আবার, শিশু বা কিশোর বয়সীরাও পণ্য ক্রয়ে পরিবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

ঘ) ভূমিকা এবং মর্যাদা (Role and Status): ভূমিকা হলো চারপাশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যক্তির কার্য সম্পাদন করাকে বুঝায়। একজন ব্যক্তি একই সাথে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, বন্ধুমহল, সংগঠন, অফিস ইত্যাদি বহুদলের সদস্য হতে পারেন। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ভূমিকার ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন: একই ব্যক্তি পরিবারে বাবা, কর্মস্থলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কখনো ক্লাবের সভাপতি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজের প্রতি সাধারণত শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করাকে মর্যাদা বলে। একজন ব্যক্তি তার সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

যেমন: সামাজিক মর্যাদা ভিন্নতার জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ও নিম্ন কর্মচারীর মধ্যে তাদের ক্রয় আচরণে ভিন্নতা দেখা যায়। আবার একই ব্যক্তির বিভিন্ন দলে ভূমিকা এবং মর্যাদা আলাদা হবার কারণে ভূমিকা ও মর্যাদার সাথে যেন প্রতিফলন ঘটে এমনভাবে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য বা সেবা ক্রয় করে।

যেমন: কোনো কর্মজীবি মা একইসাথে পরিবারে স্ত্রী ও মায়ের ভূমিকা পালন করে; তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাচ্চার পোশাক ক্রয় করেন; তিনি কর্মস্থলের জন্য পদমর্যাদার প্রতিফলন হয় এমনভাবে নিজের পোশাক ক্রয় করেন; আবার, বিশ্বকাপ উপলক্ষে তার প্রিয় দলের জার্সিও ক্রয় করেন। সুতরাং একই ব্যক্তি ভিন্ন ভূমিকা পালনের জন্য ভিন্নভাবে পণ্য ক্রয় করে থাকে।

৩. ব্যক্তিগত উপাদান (Personal Factor) : বয়স, আয়, পেশা, জীবন চক্র, জীবন ধারা, ব্যক্তিত্ব, নিজস্ব-ধারণার মত ইত্যাদি হলো একজন ব্যক্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যা তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে।

ক) বয়স ও জীবনচক্রের স্তর (Age and Life Cycle Stage): কোন ব্যক্তির বয়স নানাভাবে ব্যক্তির ক্রয় সিদ্ধান্তে পার্থক্য সৃষ্টি করে। একজন মানুষ তার জীবনকালে বহুবার একই চাহিদা পূরণে বিভিন্ন পণ্য এবং সেবা ক্রয় করে। যেমন: শিশু কাল, যৌবন এবং বৃদ্ধ বয়সে মানুষ একই ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে না। শিশুরা আইসক্রীম ক্রয়ে স্বাদ, গন্ধ বা রং এর প্রতি প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে, বয়স্করা আইসক্রীম ক্রয়ের সময় স্বাদের সাথে সাথে কোন উপাদান (Ingredient) দিয়ে তৈরি, স্বাস্থ্যকর কিনা ইত্যাদি দিক বিবেচনা করে। তাই জীবনচক্রের প্রত্যেকটি স্তর ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে ।

খ) পেশা (Occupation) : পণ্য এবং সেবা ক্রয় করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির পেশা প্রভাব সৃষ্টি করে। একজন রিকশাচালক এবং একজন কর্মজীবির সেবা বা পণ্য ক্রয় এক রকম হয় না। পেশার ভিন্নতার কারণে ব্যক্তির আয়, মর্যাদা, চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন কর্মকর্তার কাছে গাড়ি প্রয়োজনীয় পণ্য কিন্তু একজন সাধারণ রিকশাচালকের নিকট তা বিলাস পণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। ফলে ব্যক্তির পেশার তারতম্য পণ্য বা সেবা ক্রয়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

গ) অর্থনৈতিক অবস্থা (Economic Conditions): ক্রেতার অর্থনৈতিক অবস্থা ভোগ আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দামি পণ্য ব্যবহার এবং কম দামি পণ্য ব্যবহার মূলত ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন: বেশি আয়ের ব্যক্তি বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করে বা ছুটি কাটাতে বিদেশ ভ্রমণ করে। কিন্তু কম আয় সম্পন্ন ব্যক্তি ছুটি কাটানোর জন্য নিজদেশের মধ্যে কোনো দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করে। ঋণ গ্রহণের সুযোগ এবং ক্ষমতা ব্যক্তির জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

ঘ) জীবন-ধারা (Life-Style): জীবন-ধারা হচ্ছে ব্যক্তির জীবনধারণের ধরণ যা তার কাজ-কর্মে আগ্রহ এবং মতামতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দুই ব্যক্তির একই উপ-সংস্কৃতি, সামাজিক শ্রেণি এমনকি একই পেশার হলেও তাদের জীবনের ধাঁচে ভিন্নতার কারণে আচরণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ব্যক্তি দুঃসাহসিক, স্বাধীনচেতা সময়ানুবর্তি ইত্যাদি জীবন ধারা অনুসরণ করতে পারে।

যেমন: একজন ভ্রমণপ্রিয় ব্যক্তির অত্যাধুনিক ক্যামেরা, সাইকেল, স্পোর্টস সুজ, সানগ্লাস ইত্যাদি পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ থাকে; আবার, কোনো দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় স্থানে ভ্রমণের টিকেট তার কাছে মূল্যবান যা একজন সাধারণ ব্যক্তির কাছে ততটা মূল্যবান না। এসব কারণে বিপণনকারীকে ক্রেতার জীবন ধারা খেয়াল রেখে তার পণ্য বাজারে বিপণন করতে হয়।

ঙ) ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব ধারণা (Presonality and Self Concept): একজন ব্যক্তির নিজস্ব গুনাবলি অথবা ব্যক্তির দোষ-গুণ ইত্যাদি প্রকাশিত হয় ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে। একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে আলাদা করা যায়। সাধারণত আত্মবিশ্বাস, মনোভাব, কর্তৃত্ব বজায়ে রাখা, সৃজনশীল, মূল্যবোধ, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ সকল বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির আচরণে প্রভাব বিস্তার করে। একজন সৃজনশীল ব্যক্তির ক্রয় সাধারণ ব্যক্তির চেয়ে ভিন্নতর হয়ে থাকে।

অন্যদিকে ব্যক্তিত্বের সাথে ব্যক্তির নিজস্ব ধারণার সম্পর্ক থাকে। নিজস্ব ধারণা বলতে ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে অনুভূতি, বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষণের সমন্বয়কে বুঝায়। তাই বিপণনকারীকে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত নিজস্ব ধারণা ব্যবহার করতে হয়।

৪. মনস্তাত্ত্বিক উপাদান (Psychological Factors): মনস্তাত্ত্বিক উপাদান ব্যক্তির ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। ব্যক্তির ক্রয়-পছন্দ চারটি প্রধান মনস্তত্ত্বিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়, তা নিম্নরূপ-

ক) প্রেষণা (Motivation): প্রেষণা হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা কোনো ব্যক্তিকে তার প্রয়োজন সন্তুষ্টির জন্য উদ্দীপিত করে। ব্যক্তির দুই ধরনের প্রয়োজন থাকে। প্রথমত, জৈবিক প্রয়োজন জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন: খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, বাতাস ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রয়োজন সমাজে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ যেমন: নিরাপত্তা, সম্মান, ভালবাসা ইত্যাদি।

বিভিন্ন সময়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ অনেকগুলো প্রয়োজন অনুভব করে। একটা প্রয়োজন তখনই উদ্দেশ্যে (Motive) পরিণত হয় যখন তা ব্যক্তির মধ্যে চাপ প্রয়োগ করার মতো তীব্রতা জাগ্রত করতে পারে। প্রেষণা এমন একটি শক্তি যা মানুষকে পরিচালিত করে এবং মানুষের মধ্যে কর্ম সম্পাদনের শক্তি যোগায়। মনোবিজ্ঞানীরা প্রেষণার বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন। তবে নিম্নে ফ্রয়েডের প্রেষণা তত্ত্ব ও মাসলোর প্রেষণা তত্ত্ব আলোচনা করা হলো যা ভোক্তা বিশ্লেষণ ও বিপণনের জন্য বিশেষ অর্থ বহন করে।

⇒ ফ্রয়েডের প্রেষণা তত্ত্ব (Freud’s Theory of Motivation): মনোবিজ্ঞানী Sigmunel Freud বলেন, যে সকল মনস্তাত্ত্বিক শক্তিগুলো মানুষের আচরণ গঠনে সাহায্য করে সেসব শক্তি সম্পর্কে মানুষ অসচেতন থাকে। তবে মানুষ অনেক তাড়নাকে অবদমিত করে আস্তে আস্তে বড় হয়। এ তাড়নাগুলোকে মন থেকে বাদ দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বিভিন্ন ভাবে ব্যক্তি এসব তাড়নার বহিঃপ্রকাশ করে।

⇒ মাসলোর প্রেষণা তত্ত্ব (Maslow’s Theory of Motivation) : বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ Abraham Maslow ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষ কেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট প্রয়োজন দ্বারা তাড়িত হয়। মানুষ নিজের প্রয়োজনের গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রমাগতভাবে তার ক্রম- বর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট থাকে । মানুষের অভাব আছে বলেই মানুষ কাজ করে। তার মতে, ব্যক্তির একটি অভাব পূরণ হবার সাথে সাথেই আরও একটি অভাব সে অনুভব করে। চিত্র ৪.৩ এ মানুষের প্রয়োজনের ধারাবাহিকতা দেখানো হলো।  প্রথমে জৈবিক প্রয়োজন এর পর মানুষ নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করে। এর পর সামাজিক, তারপর শ্রদ্ধার এবং সবগুলো প্রয়োজন পরিপূর্ণ হলে উচ্চাকাংখার প্রয়োজন অনুভব করে।

 

 

খ) প্রত্যক্ষণ (Perception): ব্যক্তি একটি পরিস্থিতিকে কিভাবে প্রত্যক্ষণ করছে তার উপর ব্যক্তির ক্রয় আচরণ নির্ভর করে। দুই ব্যক্তি একই প্রেষণায় প্রেষিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। একই বিজ্ঞাপন দুই জন ব্যক্তির ওপর দুই রকম ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একজন ব্যক্তি বিজ্ঞাপনকে সৃষ্টিশীল হিসেবে প্রত্যক্ষণ করতে পারে, আবার, অন্যজন একই বিজ্ঞাপনকে বিরক্তিকর মনে করতে পারে। বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষণ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে তিনটি প্রত্যক্ষণ প্রক্রিয়া। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো-

⇒ নির্বাচিত মনোযোগ (Selective Attention): কোনো উপযোগ বা পণ্যের প্রতি আগ্রহ বা প্রয়োজন থাকলেই সেই উপযোগ বা পণ্য পাবার জন্য মানুষের মনোযোগ আকর্ষিত হয়। বিপণনকারী বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তাকে আকর্ষিত করতে চেষ্টা করে। একজন মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য উদ্দীপকের মুখোমুখী হয়। সবগুলোর প্রতি তার সমান মনোযোগ দেওয়া সম্ভবপর নয়। ধরা যাক, যদি কোনো ব্যক্তির একটি টেলিভিশন ক্রয়ের প্রয়োজন অনুভব করে তবে সে টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনের প্রতি বেশি মনোযোগী হবে। ফলে বিপণনকারীকে ভোক্তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়।

⇒ নির্বাচিত বিকৃতকরণ (Selective Distortion): নির্বাচিত বিকৃতকরণ হলো মানুষের তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের সাথে প্রাপ্ত তথ্যসমূহের খাপ-খাওয়ানো বা অভিযোজনের প্রবণতা। যেমন: ব্যক্তিটি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টেলিভিশনের বিজ্ঞাপন দেখলেও সে শুধুমাত্র পূর্ব পরিচিত ব্র্যান্ডের আগ্রহী থাকে বা পরিচিত ব্র্যান্ডের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। বিপণনকারীকে সেকারণে ভোক্তার অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান কিভাবে প্রসার কার্যক্রমে ও বিক্রয় তথ্যকে প্রভাবিত করে সে সম্পর্কে জানতে হয়।

⇒ নির্বাচিত ধারণ (Selective Retention) : ব্যক্তির আগ্রহ ও প্রয়োজন থাকার পরও অনেক উদ্দীপকই সে ভুলে যায়। কিন্তু যে সকল তথ্য ব্যক্তির বিশ্বাস এবং মনোভাবকে সমর্থন করে সে সকল তথ্য মনে রাখার বা ধারণ করার প্রবণতা বেশী থাকে। মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা বিশ্বাসের সাথে সংগতি রয়েছে এমন বাছাইকৃত তথ্য বা বিষয় মনে রাখার প্রবণতাকে নির্বাচিত ধারণ বলে। যদি এলজি (LG) টেলিভিশনের প্রতি ব্যক্তির অনুকূল মনোভাব থাকে তবে সে শুধুমাত্র এলজি টেলিভিশনের ইতিবাচক বিষয়গুলোই মনে রাখার চেষ্টা করে।

গ) শিক্ষণ (Learning): অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তনকেই শিক্ষণ বলে। ব্যক্তি বিভিন্ন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হলে শিক্ষনের মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে বের করে। ব্যক্তির বেশির ভাগ আচরণই শিক্ষালব্ধ। বিপণনকারী বার বার বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্যক্তির ক্রয় মনোভাবকে জাগ্রত করে। আবার শিক্ষণের মাধ্যমে ক্রেতার মধ্যে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড আনুগত্যতা সৃষ্টি করে। সুতরাং বিপণনকারী শিক্ষণের মাধ্যমে পণ্যকে তীব্র তাড়নার সাথে সম্পর্কিত করে ও প্রেষণামূলক সংকেত ব্যবহার করে তার পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে।।

ঘ) বিশ্বাস এবং মনোভাব (Beliefs and Attitudes): সাধারণত ব্যক্তির বিশ্বাস ও মনোভাব তৈরি হয় কর্ম ও শিক্ষার মাধ্যমে। বিশ্বাস হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে ব্যক্তির বর্ণনামূলক চিন্তাভাবনা। বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের ধারণা, মতামত, ঘটনা বা পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতের এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মানুষের মনোভাব সৃষ্টি হয়। আর, মনোভাব হলো কোনো বিশেষ কাজ বা ধারণার প্রতি ব্যক্তির তুলনামূলক মূল্যায়ন অনুভূতি এবং মানসিকতা। যেমন: এলজি (LG) টেলিভিশনের গুণগতমান সম্পর্কে ভোক্তার মনে ইতিবাচক বিশ্বাস থাকলে ভোক্তা এলজি (LG) টেলিভিশন ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী থাকবে।

ভোক্তার মনে এ বিশ্বাস প্রকৃত জ্ঞান, আস্থা অথবা মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্টিত হয়। বিপণনকারীর দায়িত্ব হচ্ছে ব্যক্তির মধ্যে বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা। যদি পণ্য সম্পর্কে ভোক্তাদের ভুল বিশ্বাস থাকে তবে সেটা সংশোধন করার ব্যবস্থা নিতে হয়। অন্যদিকে, মনোভাব দ্বারা ব্যক্তির কোনো ধারণা বা বিষয় সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় মূল্যায়ন, অনুভূতি এবং প্রবণতা প্রকাশ পায়। রাজনীতি, ধর্ম, সংগীত, পোশাক, খাদ্য, জীবন প্রণালীসহ প্রায় সব বিষয়ে মানুষের একটা নিজস্ব মনোভাব থাকে। এ মনোভাব মানুষের মধ্যে এমন একটা কাঠামো তৈরি করে যা দ্বারা সে কোনো বিষয় নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করে অথবা সেখান থেকে বিরত থাকে। বিপণনকারী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ভোক্তাদের ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করা ।

ঙ) স্মৃতি (Memory): মানুষের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণের বিষয়সমূহ সংরক্ষণের ক্ষমতা হলো স্মৃতি। স্মৃতির মাধ্যমে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে যা শেখে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। স্মৃতি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিপণনকারী সবসময়ই চেষ্টা করে এমনভাবে তথ্য ও অভিজ্ঞতা প্রদান করার জন্য যেনো ক্রেতা ও ভোক্তা সেটা স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে।

চ) আবেগ (Emotions): আবেগ হলো একটি জটিল ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য মানসিক অবস্থা। ব্যক্তি আবেগের কারণে আনন্দ বা বিরক্তি প্রকাশ করে। অনেকসময়ই আবেগতাড়িত হয়ে ক্রেতা পণ্য ক্রয় করে আবার, ক্রয় করা থেকে বিরত থাকে। বিপণনকারীকে এজন্য ক্রেতা ও ভোক্তার আবেগকে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, ভোক্তা আচরণে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্বিক উপাদানের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবের কারণে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

সারসংক্ষেপ :

পণ্যসামগ্রী বা সেবাকর্ম ক্রয়ের সময় একজন ক্রেতা যে সকল কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে সে সকল কাজের সাথে | সম্পর্কিত সকল আচরণকে ভোক্তার আচরণ বলে। ভোক্তা আচরণের মডেলে ভোক্তার আচরণ প্রক্রিয়াতে যে বিষয়সমূহ নিয়মিত ঘটে তার সংক্ষিপ্ত উপস্থাপন করা হয়। এ মডেলে দেখানো হয়েছে বিপণন উদ্দীপক ও অন্যান্য উদ্দীপক কীভাবে | ভোক্তাকে প্রভাবিত করে। বিপণন উদ্দীপক বলতে বিপণন মিশ্রণের চারটি মূল উপাদান যেমন- পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও | প্রসারকে বুঝানো হয়েছে যা বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে ।

বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপকসমূহ বিভিন্নভাবে ক্রেতার নিজের বৈশিষ্ট্য ও ক্রেতার সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব সৃষ্টি করে। এই সব মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্রেতা সাড়া প্রদান করে। ভোক্তার ক্রয় তার সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতি, উপ-সংস্কৃতি ও সামাজিক শ্রেণি। সামাজিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে রেফারেন্স গ্রুপ, পরিবার, ভূমিকা এবং মর্যাদা। আবার, ব্যক্তিগত উপাদানগুলো হলো বয়স ও জীবনচক্রের স্তর, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবন ধাঁচ, ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব ধারণা। সর্বশেষে মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের মধ্যে প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ, বিশ্বাস এবং | মনোভাব, স্মৃতি এবং আবেগ আলোচনা করা হয়েছে।

ভোক্তা আচরণ

১ thought on “ভোক্তা আচরণ”

Leave a Comment