সেবার বিপণন কৌশলসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “পণ্য, সেবা ও ব্র্যান্ড” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।
সেবার বিপণন কৌশলসমূহ
সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বিপণন কৌশলসমূহ
Marketing Strategies for Services
সেবামূলক কোম্পানিগুলো বিপণন কৌশলসমূহ ব্যবহার করে ভোক্তার চাহিদা ও আকর্ষণ বৃদ্ধি করার প্রয়াসে। দৃশ্যমান বস্তুগত পণ্যের তুলনায় অদৃশ্যমান সেবার বিপণন ও ক্রেতা চাহিদা সৃষ্টি অধিক কঠিন। কারণ সেবামূলক ব্যবসায় ভোক্তা এবং সেবা প্রদানকারী কর্মচারীর যৌথ অংশগ্রহণেইে উত্তম সেবার সৃষ্টি হয়। পৃথক বৈশিষ্ট্য এবং যৌথ প্রযোজন সেবামূলক পণ্যের বিপণনের প্রধান চ্যালেঞ্জিং বিষয় কার্যকর সহযোগিতা বা আবার সেবা প্রদানকারীর দক্ষতা এবং সহায়ক সুযোগ-সুবিধায় সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে। এ জন্যই সফল সেবামূলক কোম্পানিগুলো তাদের কর্মচারী বা সেবা প্রদানকারী এবং ক্রেতা উভয় পক্ষের ওপর মনোযোগী হয়। তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য সেবামূলক কোম্পানিগুলো সাধারণত নিম্নোক্ত কৌশলগুলো অবলম্বন করে থাকে।

১. সেবা মুনাফা কৌশল (Service Profit Chain): বিপণনের অধিক সফলতার লক্ষ্যে সেবামূলক কোম্পানিগুলো প্রতিষ্ঠানের মুনাফার সাথে সেবা প্রদানকারী কর্মী এবং ভোক্তা বা ক্রেতাদের যোগাযোগ স্থাপন করে । প্রতিষ্ঠানের মুনাফা অর্জনের জন্য কর্মী ও ক্রেতার পারস্পরিক সমঝোতা এবং সহযোগিতা অন্যতম হাতিয়ার। যে শৃঙ্খলার সাহায্যে সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ কর্মচারী এবং ক্রেতাদের সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে থাকে, তাকে সেবা মুনাফা চেইন বলে।
ক. অভ্যন্তরীণ বিপণন (Internal Marketing): আন্তঃবিপণন বলতে ব্যবসায় প্রতিযোগিতার অভ্যন্তরীণ সেবা প্রদানকারী এবং অন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান করাকে বোঝায়। উত্তম সেবা প্রদান করার জন্য বিপণনকারীকে প্রথমত নিজ কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সব কর্মীকে ক্রেতাকেন্দ্রিক করতে হবে। ভোক্তা সেবা প্রদানের জন্য সেবা প্রদানকারীদের নিজ কোম্পানির ব্র্যান্ড ভ্যালু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং ক্রেতাকেন্দ্রিকতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করাই হলো মূল শর্ত।
খ. বাহ্যিক বিপণন (External Marketing): ভোক্তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সেবা উৎপাদন, মূল্য নির্ধারণ, সেবা প্রদানের ব্যবস্থাপনা এবং ভোক্তাদের সেবা ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যাবতীয় বিপণন কার্যাবলি নির্ধারণ, নির্দিষ্ট সময় পর পর নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন ও বাস্তবায়ন ইত্যাদি সমস্ত কার্যাবলির সমন্বয়কেই বাহ্যিক বিপণন বলে। বাহ্যিক বিপণন মূলত কোম্পানি থেকে ক্রেতা বা ভোক্তাদের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হয় ।
গ. আন্তঃক্রিয়াশীলর বা মিথস্ক্রিয়া বিপণন (Interactive Marketing) : সেবা বিপণনে ক্রেতার সেবার সর্ব্বোচ গুণগত মান প্রাপ্তি নির্ভর করে সেবা প্রদানকারীর ওপর এবং তার সেবা প্রদানের ধরনের ওপর। সেবা প্রদানকারী এবং ক্রেতা উভয় পক্ষের সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কের মাধ্যমেই উত্তম সেবা সৃষ্টি হয় । আন্তঃক্রিয়াশীল বা মিথস্ক্রিয়া বিপণনের মূল বক্তব্য হলো উত্তম সেবা প্রদান এবং ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সেবা প্রদানকারী ও ভোক্তার মাঝে সুসম্পর্ক গঠন ও ভোক্তাকে সেবা উৎপাদানের সহউৎপাদক হিসেবে নিয়োজিত করে সেবার গুণাগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। আন্তঃক্রিয়াশীলতা যত বেশি বৃদ্ধি পাবে তত বেশি সেবা প্রদান ও উত্তম সেবা তৈরি করার পরিবেশ নিশ্চিত হবে ।

২. সেবা পৃথকীকরণ ব্যবস্থাপনা (Service Differentiation Management): তীব্র প্রতিযোগিতা এবং একই ধরনের সেবার সহজলভ্যতার কারণে ক্রেতারা অনেক সময় বিভিন্ন সেবার মানের পার্থক্য বুঝতে পারে না। এক্ষেত্রে কোম্পানি সেবা বিক্রয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতা সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হয় না। এ জন্য সেবা বিপণনকারীকে সর্ব্বোচ ক্রেতা সন্তুষ্টি অর্জন এবং বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য সেবা পৃথকীকরণের ব্যবস্থা করতে হয়। কোম্পানিকে মূলত সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য মৌলিক সেবার সাথে নতুন অথবা উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্যযুক্ত সেবার প্রস্তাব, উত্তম সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কোম্পানির অনুকূল ভাবমূর্তি তৈরির মাধ্যমে সেবা পৃথকীকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যা নির্দিষ্ট কোম্পানিকে বাজারের অন্য সবার থেকে আলাদা হিসেবে পরিচিত করবে।
উদাহরণ: আর.এফ.এল (RFL) কোম্পানি তাদের প্লাস্টিক পণ্য শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ক্রেতাদের মাঝে বিক্রয় করে না বরং নিজের বেস্টবাই (Bestbuy) আউটলেটের মাধমে সব ধরনের পণ্য ক্রেতাদের সুবিধাজনক স্থানে বিক্রয় করে এবং একই সাথে othoba.com-এর মাধ্যমে হোম ডেলিভারি সার্ভিস প্রদান করে। আবার, নভোএয়ার (Novoair) নির্দিষ্ট ফ্লাইটের টিকিট বিক্রয়ের পাশাপাশি নভোএয়ার ট্যুরিজম সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, হোটেল, যাতায়াত এবং খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাসহ প্যাকেজ বিক্রয় করে থাকে, যাতে ক্রেতারা এক কোম্পানি থেকে সহজেই এয়ার টিকিটসহ ভ্রমণের সব ধরনের প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পারে।
৩. সেবার মান ব্যবস্থাপনা (Service Quality Management): সেবার মান নির্ধারণ এবং বিচার করা বস্তুগত পণ্যের থেকে অনেক আলাদা এবং কঠিন। কারণ সেবা গ্রহণকারী এবং সেবা প্রদানকারী পরিবর্তনের সাথে সাথে সেবা সম্পর্কিত অভিজ্ঞতাও পরিবর্তন হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো সবসময় চেষ্টা করে উচ্চ গুণগত মান তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করার। একজন ক্রেতাকে সবসময় এটি মুক্ত সেবা প্রদান ও ক্রেতাদের অভিযোগসমূহ সতর্কতার সাথে সমাধান করা এবং সেই সাথে অভিযোগসমূহকে পরবর্তী সময়ে সেবার মান উন্নয়নের দিকনির্দেশনা হিসেবে মূল্যায়ন করাই গুণগত সেবা সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য। এছাড়া বিপণনকারীকে সবসময় প্রতিযোগীদের সেবার গুণগত মান বিশ্লেষণ, তাদের থেকে উন্নত সেবা প্রদান এবং বিপণন কার্যাবলির দিকে নজর রাখতে হবে।
৪. সেবার উৎপাদনশীলতা ব্যবস্থাপনা (Service Productivity Management): তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মূল্যবৃদ্ধির গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিপণনকারীদের সর্বদা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার প্রচেষ্টায় থাকতে হয়। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য বিপণনকারী মূলত তিন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। প্রথমত, বিপণনকারী নতুন ও অভিজ্ঞ কর্মী নিয়োগ দিতে পারে অথবা বর্তমান কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অধিক উৎপাদনক্ষম করে গড়ে তুলেতে পারে। দ্বিতীয়, সেবার মানের কিছু বৈশিষ্ট্য বর্জন করে উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনের গতি বৃদ্ধি করতে পারে। এক্ষেত্রে বিপণনকারীকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খরচ কমানোর সাথে সাথে ভোক্তার সন্তুষ্টি বজায় রাখার দিকটিও বিবেচনা করতে হবে।

সারসংক্ষেপ
সহজ কথায় সেবা হলো একধরনের অদৃশ্যমান বিষয়, যা ক্রয় করে ক্রেতা কিছু সুবিধা বা তৃপ্তি পায়। তীব্র | প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য সেবামূলক কোম্পানিগুলো কিছু কৌশল অবলম্বন করে থাকে। যথা: সেবা | মুনাফা কৌশল, সেবা পৃথকীকরণ ব্যবস্থাপনা, সেবার মান ব্যবস্থাপনা ও সেবার উৎপাদনশীলতা ব্যবস্থাপনা । সেবা মুনাফা | কৌশলের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ বিপণন, বাহ্যিক বিপণন ও আন্তঃক্রিয়াশীলর বা মিথষ্ক্রিয়া বিপণন গুরুত্বপূর্ণ।

১ thought on “সেবার বিপণন কৌশলসমূহ”